কারাগারের চার দেয়াল পেরিয়ে হাতে ভ্যান, নতুন জীবনের পথে মিঠু-ইসরাফিল
দীর্ঘ কারাভোগ শেষে মুক্তি, জীবিকার অনিশ্চয়তায় জেলা প্রশাসনের সহায়তা
জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালে। মুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও সামনে ছিল জীবিকার অনিশ্চয়তা। কাজের সুযোগ না থাকায় পরিবার নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছিলেন রাজশাহীর মিঠু ও মো. ইসরাফিল। তাঁদের সেই অনিশ্চয়তার জীবনে আশার আলো হয়ে এসেছে দুটি ভ্যান। কর্মসংস্থানের জন্য তাঁদের হাতে ভ্যান তুলে দিয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনে মিঠু ও ইসরাফিলের হাতে ভ্যান দুটি তুলে দেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। এ সময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম সম্পা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী উপস্থিত ছিলেন।
কারামুক্তির পর জীবিকার চিন্তা
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়ার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি ভ্যান চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন মিঠু। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি ভ্যান দেওয়া হয়।
ভ্যান হাতে পেয়ে মিঠু বলেন, জীবনের অনেকগুলো বছর কারাগারে কেটেছে। মুক্তির পর বাইরে এসে কীভাবে সংসার চালাবেন এবং নিজের পায়ে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসক স্যার আমার কষ্টের কথা শুনে আমাকে একটি ভ্যান দিয়েছেন। এই ভ্যান আমার কাছে শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি নতুন করে বাঁচার অবলম্বন।”
দীর্ঘদিন পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কথা উল্লেখ করে মিঠু বলেন, মুক্তির পর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও হাতে কোনো কাজ ছিল না। এখন ভ্যান চালিয়ে আয় করতে পারবেন এবং নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারবেন।
৩০ বছরের সাজা শেষে মুক্তি
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের নথি অনুযায়ী, মিঠু ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। ২০০৩ সালের ১১ অক্টোবর থেকে তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর চলতি বছরের ১৬ জুলাই সাজা শেষে তিনি মুক্তি পান।
কারাগার থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ সময় কর্মজীবনের বাইরে থাকায় জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের দেওয়া ভ্যান তাঁর জন্য আয়ের একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
২৩ বছর পর মুক্ত ইসরাফিল
মিঠুর মতোই দীর্ঘ কারাজীবনের পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন বাগমারার মো. ইসরাফিল। তাঁর বাবার নাম রহিম উদ্দিন। প্রায় ২৩ বছর কারাভোগের পর তিনি মুক্ত জীবনে ফিরেছেন।
দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকায় তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তির পর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকেও একটি ভ্যান দেওয়া হয়েছে।
দুটি ভ্যান হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়া এই দুই ব্যক্তির সামনে জীবিকা নির্বাহের একটি বাস্তব পথ তৈরি হয়েছে। এখন ভ্যান চালিয়ে আয় করে নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সহযোগিতা করতে পারবেন তাঁরা।
‘বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারবেন’
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়া এই দুই ব্যক্তি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কারাগার পরিদর্শনের সময় তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “তাঁদের দেখেছি, তাঁরা নিতান্তই গরিব। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কী করবেন, সেটি নিয়ে তাঁরা চিন্তিত ছিলেন। তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারবেন।”
এই উদ্দেশ্যেই তাঁদের দুটি ভ্যান দেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
কাজী শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, কারাভোগ শেষে তাঁরা যাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্যান দুটির মাধ্যমে মিঠু ও ইসরাফিল নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দীর্ঘ কারাজীবনের পর মুক্তি পেলেও জীবিকার অনিশ্চয়তা অনেকের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ কঠিন করে তোলে। মিঠু ও ইসরাফিলের হাতে জেলা প্রশাসনের তুলে দেওয়া দুটি ভ্যান সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘ কারাভোগের পর নতুন করে জীবন শুরু করার সংগ্রামে তাঁদের কাছে এই সহায়তা হয়ে উঠেছে নতুন পথচলার অবলম্বন।
এসএ




Comments