Image description

পদ থেকে অপসারণের পরও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. নুরুল ইসলাম। চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রকৌশলীর স্পষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি এখনো অফিস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সেচ প্রকল্পের প্রায় ২৫০টি কাজের শত কোটি টাকার দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে পদচ্যুত এই কর্মকর্তা দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়েও টালবাহানা করছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর উপসচিব মো. মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলামকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

অথচ অপসারণের পরও তিনি নিয়মিত অফিস করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আগে আহ্বান করা দরপত্রের সুযোগ নিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতা করছেন বলেও জানা গেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর নোটিশ জারি করা প্রায় ২৫০টি নির্মাণকাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে তিনি বড় অঙ্কের টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর প্রভাবের ভয়ে স্থানীয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর আহ্বান করা দরপত্রের আওতায় অনেক খাল পুনঃখননের কাজ কাগজে-কলমে এখনো শেষ না হলেও বাস্তবে নুরুল ইসলামের নিজস্ব লোকজন দিয়ে আগেই করিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ৫০টি গ্রুপের মালামাল সরবরাহের কাজের প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে এমন কিছু আইডি যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর বিপরীতে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই বলে জানা গেছে।

এদিকে গত ২১ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটির (টিএসসি) সভায় ওই দরপত্রের সময়সীমা আরও ১৫ দিন বাড়ানোর মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে রহস্যজনক কারণে ই-জিপিতে তা সংশোধন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুটি মামলা, বারবার বদলি

নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুটি দুর্নীতির মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সালে মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে নিজের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গাড়ি সরবরাহের কাজ দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর চার মাসের মাথায় ২০ জুন তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে হবিগঞ্জে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।

হবিগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভবন নির্মাণেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিএডিসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি ভবন নির্মাণের কাজে প্রায় ৩৬টি খাতে অনিয়ম চিহ্নিত করে। এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টার খসে পড়া, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার এবং কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবারই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে শুধু বদলি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে তিনি বারবার বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ, নিজেই মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি

সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ভূ-উপরিস্থ সেচ প্রকল্পে নিয়ম লঙ্ঘন করে একসঙ্গে প্রায় ২৫০টি কাজের দরপত্র আহ্বান করে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন নুরুল ইসলাম। কাজের মান নিশ্চিত করতে সাধারণত ধাপে ধাপে দরপত্র আহ্বানের নিয়ম থাকলেও তিনি তড়িঘড়ি করে তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানকারী কর্মকর্তা মূল্যায়ন কমিটির প্রধান হতে পারেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ই-জিপির দোহাই দিয়ে তিনি নিজেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, মুজিবনগর প্রকল্পে বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমআরএস বিপ্লব ট্রেডার্সকে দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের নতুন ম্যানুয়াল টেন্ডারেও ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিযোগিতা দেখাতে আরেকটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্র জমা দেওয়ানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ে নতুন পরিবর্তনের পর ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় অপসারিত এই কর্মকর্তা দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং চলমান টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. নুরুল ইসলামকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সংযোগ রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে যুগ্ম পরিচালক (বীজ বিপণন) মো. মাহমুদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এরপর বিএডিসির সচিব (উপসচিব) আবু জাফর রাশেদকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সংযোগ রিসিভ করেননি।

এসএ