আবারও এলপিজির সংকট ফেনীর বাজারে
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ
দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই বলে আমদানিকারক ও অপারেটররা দাবি করলেও ফেনীর কয়েকটি বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন বিক্রেতারা। একই সঙ্গে কয়েকজন ভোক্তা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে বলেও জানিয়েছেন। এতে ফেনীর খুচরা বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফেনী শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক, লালপোল, পাঁচগাছিয়া ও মোহাম্মদ আলী বাজারে খোঁজ নিয়ে কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে সরবরাহে কিছুটা চাপের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দোকানে পর্যাপ্ত মজুত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলপিজি বিক্রেতা শহিদুল হক বলেন, আগের তুলনায় বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া কিছুটা কঠিন হচ্ছে। ডিলারদের কাছ থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় সবসময় গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আরেক বিক্রেতা বাহাদুর বলেন, “ডিলারের কাছ থেকে সবসময় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দোকানে পর্যাপ্ত মজুত রাখা কঠিন হচ্ছে।”
তবে সরবরাহ কমে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিক্রেতারাও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। তাদের বক্তব্য মূলত ডিলার পর্যায় থেকে কম সরবরাহ পাওয়ার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে।
অন্যদিকে কয়েকজন ভোক্তা জানিয়েছেন, নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতেও তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ভোক্তা নজরুল বলেন, নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পেয়ে তাকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। তিনি বলেন, “দোকানে গিয়ে নির্ধারিত দামের কথা বললে অনেক সময় সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। পরে বেশি দামে কিনতে হয়েছে।”
ভোক্তা সবুজ বলেন, “একাধিক দোকানে খোঁজ নেওয়ার পর সিলিন্ডার পাওয়া গেছে। কোথাও দাম নিয়ে ভিন্ন কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
আরেক ভোক্তা নাহিদ বলেন, “এলপিজি আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। দাম বেশি হলে পরিবারের মাসিক খরচে চাপ পড়ে। বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর আছে কি না, সেটি সংশ্লিষ্টদের দেখা উচিত।”
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ সেপ্টেম্বর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। ফলে ভোক্তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়া হচ্ছে কি না, তা স্থানীয় বাজারে যাচাইয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি এলপিজির সরবরাহ নিয়ে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আমদানিকারক ও এলপিজি অপারেটররা দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে জানান।
এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি পরিবহনে জাহাজভাড়া ও ট্রেডারদের প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় নতুন কার্গো আমদানিতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এসব ব্যয়ের প্রভাব সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় পড়তে পারে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে খুচরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এর দুই দিন পর, ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনলাইন সভায় দেশের কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজি বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন মন্ত্রী। বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে আমদানিকারক ও অপারেটরদের ‘সংকট নেই’ বক্তব্যের বিপরীতে ফেনীর খুচরা বাজারে বিক্রেতাদের সরবরাহ কম পাওয়ার কথা বলার বিষয়টি দুই ধরনের বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ পার্থক্যকে সরাসরি কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত কারণ জানতে ডিলার ও পরিবেশক পর্যায়ের সরবরাহের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ফেনীতে নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে কি না, কোন পর্যায়ে সরবরাহ কমছে, খুচরা বিক্রেতারা কত দামে সিলিন্ডার কিনছেন এবং কী দামে বিক্রি করছেন—এসব তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বাজারের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
স্থানীয় বাজারে সরবরাহের ঘাটতি থাকলে তার কারণ চিহ্নিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি কোথাও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ থাকে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এলপিজি এখন অনেক পরিবারের রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি। সরবরাহে অনিশ্চয়তা বা দামে বাড়তি চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।
ফেনীর ভোক্তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাজারে এলপিজির সরবরাহ, ডিলার পর্যায়ের বিতরণ, মজুত ও খুচরা বিক্রয়মূল্য যাচাই করবে। একই সঙ্গে বাজারে সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ‘সংকট নেই’ দাবি এবং ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যকার পার্থক্যও স্পষ্ট হবে।
এসএ




Comments