ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতা বড় কারণ
কঠোর মূল্যায়নেই কি রাজশাহী বোর্ডে ফল বিপর্যয়?
৭ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার ৬৩.৬৭%; কমেছে জিপিএ-৫
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের পতন নতুন করে সামনে এনেছে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন। সাত বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার—৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এক বছর আগেও যে হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ, এবার তা কমেছে ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট। শুধু পাসের হার নয়, একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী এবং শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। বিপরীতে বেড়েছে শূন্য পাস ও অত্যন্ত কম পাস করা বিদ্যালয়।
তবে ফলাফলের এই ধসকে শুধু খাতা মূল্যায়নের কঠোরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ নয় বোর্ড। বোর্ডের প্রাথমিক মূল্যায়নে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত নম্বর বা কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়া, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা, নিয়মিত পড়াশোনায় অনীহা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার কারণে বইবিমুখতা। পাশাপাশি যেসব বিদ্যালয়ের ফলাফল সবচেয়ে খারাপ হয়েছে, সেগুলোকে আলাদাভাবে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কঠোর মূল্যায়ন, নেই গ্রেস মার্ক
এবারের ফলাফলে বড় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে খাতা মূল্যায়নের ধরনকে সামনে আনছে বোর্ড। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়নের স্বার্থে এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ধরনের শিথিলতা রাখা হয়নি। অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া বা ‘ওভারমার্কিং’-এর সুযোগও ছিল না। ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় প্রকৃত অর্জিত নম্বরই ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
এর প্রভাব যে ফলাফলে পড়েছে, তা পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। গত বছর ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলেও এবার পাস করেছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের পতন।
তবে এখানেই প্রশ্ন—শুধু মূল্যায়ন কঠোর হওয়ার কারণেই কি এত বড় পতন? কারণ একই সঙ্গে জিপিএ-৫ কমেছে ৫ হাজার ৭১৪টি। ২০২৫ সালে যেখানে ২২ হাজার ৩২৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল, এবার পেয়েছে ১৬ হাজার ৬১৩ জন।
ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতা বড় কারণ
বোর্ডের প্রাথমিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইংরেজি ও গণিত। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতার মতো এবারও এই দুই আবশ্যিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রত্যাশিত নম্বর পায়নি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ দুটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বলে বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এখানেই ফল বিপর্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। একটি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা যদি বছরের পর বছর ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে দুর্বল থাকে, তাহলে শুধু পরীক্ষার খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করলেই সেই দুর্বলতা তৈরি হয় না। বরং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক নজরদারি—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব এতে থাকতে পারে।
বইবিমুখতা কতটা দায়ী?
বোর্ডের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় শিক্ষার্থীদের বইবিমুখতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের মতে, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নিয়মিত ক্লাসের বাইরে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ছাত্র ও ছাত্রীদের ফলাফলের ব্যবধানও এ ক্ষেত্রে আলোচনার দাবি রাখে। এবার ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ হলেও ছাত্রদের পাসের হার মাত্র ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট।
অর্থাৎ একই শিক্ষাব্যবস্থায় পড়েও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফলাফল এতটা ভালো হওয়ার কারণ কী—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। শুধু ‘বইবিমুখতা’ দিয়ে এর ব্যাখ্যা কতটা সম্ভব, সেটিও শিক্ষা বিশ্লেষণের বিষয়।
শতভাগ পাসের বিদ্যালয় কমেছে ৬৪টি
ফল বিপর্যয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র পাওয়া যায় বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলে। গত বছর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে শতভাগ পাস করা বিদ্যালয় ছিল ৯৯টি। এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা বিদ্যালয় কমেছে ৬৪টি।
অন্যদিকে গত বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন বিদ্যালয় ছিল না। এবার ৫টি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ০ থেকে ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে—এমন বিদ্যালয় রয়েছে ১১টি।
এই পরিসংখ্যানই মূলত বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তুলে দিয়েছে—এক বছরের ব্যবধানে এতগুলো বিদ্যালয়ের ফলাফল কেন এতটা খারাপ হলো?
বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি বিদ্যালয়ের ফলাফল ধরে ধরে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে শূন্য পাস ও অত্যন্ত কম পাস করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষকতা, পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জবাবদিহিও চাওয়া হবে।
পাসের হার কমে যাওয়া এবং ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী মুঠোফোনে এক ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এবারের ফলাফলকে কোনোভাবেই বিপর্যয় বলা চলে না। এটিই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতা বলেই এই ফলাফল অর্জন করেছে।
চেয়ারম্যান আরও উল্লেখ করেন, সঠিক পড়াশোনা এবং খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা বজায় রাখলে রেজাল্ট এমনই হয়। তাই এই ফলাফল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই জানিয়ে তিনি বোর্ডের সার্বিক ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সাত বছরের ব্যবধানেই বড় চিত্র
রাজশাহী বোর্ডের ফলাফলের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট।
একই সময়ে এবারের ফলাফলে জিপিএ-৫, শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়—সব ক্ষেত্রেই পতন দেখা গেছে। ফলে এটি শুধু একটি পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার ঘটনা, নাকি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা ও বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার মানের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের প্রতিফলন—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষ মূল্যায়ন সভা করবে বোর্ড
ফলাফলের এই পতনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং শূন্য পাসের বিদ্যালয় তৈরি হওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে দ্রুত বিশেষ মূল্যায়ন সভা করা হবে।
বোর্ডের বক্তব্য, মেধার সঠিক মূল্যায়নের স্বার্থে এবার খাতা দেখায় কোনো প্রকার শিথিলতা রাখা হয়নি। একই সঙ্গে ফলাফলের নেতিবাচক দিকগুলোও এড়িয়ে না গিয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমস্যার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হবে।
এদিকে ফলাফল নিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর সন্দেহ বা আপত্তি থাকলে তার জন্য পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা যাবে। এতে মানবীয় ভুল, নম্বর যোগে ত্রুটি বা মূল্যায়ন-সংক্রান্ত কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে।
সব মিলিয়ে এবারের ফলাফল রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের জন্য শুধু একটি ‘খারাপ ফল’ নয়; বরং শিক্ষার গুণগত মান, বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি বড় সতর্কসংকেত। কঠোর মূল্যায়ন যদি বাস্তব চিত্রটি সামনে এনে থাকে, তাহলে এখন সেই চিত্রের কারণ শনাক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে যাওয়া—এটাই হবে বোর্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ।
এসএ




Comments