জাল সনদ ও বিদেশে অবস্থান: ৮ শিক্ষক নিয়ে বিপাকে জিয়ানগরের ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
জাল নিবন্ধন সনদে চাকরি, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানের অভিযোগে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিপাকে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আট শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের তিন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, দক্ষিণ ইন্দুরকানী সপ্তগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার ডাকুয়া ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দুর্গাপূজার ছুটিতে ভারতে যান। এরপর তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি। তবে অভিযোগ রয়েছে, তার ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত বেতন-ভাতা জমা হচ্ছে।
এদিকে তার চাকরির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, রণজিৎ কুমার ডাকুয়া ২০০২ সালের ৬ অক্টোবর ওই প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন। পরে ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।
পশ্চিম বালিপাড়া নুরিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী নূর এলাহী ২০২৪ সালের ৫ জুন তিন দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে সৌদি আরবে যান। ছুটি শেষ হলেও তিনি আর কর্মস্থলে ফেরেননি বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, বালিপাড়া ইউনিয়ন আলিম মাদ্রাসার আইসিটি বিষয়ের প্রভাষক মাসুদ করিম ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঢাকায় অন্য একটি চাকরি করছেন।
এছাড়া জাল নিবন্ধন সনদে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে ইন্দুরকানী মেহেদীউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নাসরিন আক্তার, পঞ্চগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক প্রতিভা রানী এবং ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক হাবিবা আক্তারের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই তিন শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ জাল প্রমাণিত হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০২২ সালের ২২ জুন এক পত্রে তাদের উত্তোলিত অর্থ ফেরত নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। এরপর থেকে তারা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় শূন্য পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগও করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, টগড়া দারুল ইসলাম কামিল মাদ্রাসার মুহাদ্দিস কাওছার হোসেন ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ব্যক্তিগত কারণে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। একই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. দেলোয়ার হোসেনও ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত বলে জানা গেছে।
ইন্দুরকানী মেহেদীউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন গাজী বলেন, “নাসরিন আক্তার নামে একজন শিক্ষকের সনদ তদন্তে জাল প্রমাণিত হওয়ায় তার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মাউশিতে ব্রডশিট জবাব পাঠানো হয়েছে।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “এসব শিক্ষকের তালিকা প্রস্তুত করে ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মেহেদীউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিষয়ে মাউশিতে লিখিত পাঠানো হয়েছে।”
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক অনুপস্থিতি এবং জাল সনদের অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এসএ




Comments