ময়মনসিংহে ডেঙ্গু-হামের তাণ্ডব
৭১ শিশুর মৃত্যু হলেও চালু হয়নি শিশু আইসিইউ
দিন যত যাচ্ছে, ময়মনসিংহে ডেঙ্গু ও হামের পরিস্থিতি ততই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ার পাশাপাশি হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মারা গেছে ৭১ শিশু।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ৪৮ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ১৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বুধবার সকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া দুজন হলেন—ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আব্দুল বারেকের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন (৪০) এবং ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সোহাগী গ্রামের আসাদ মিয়ার ছেলে রুবন (৪০)।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন অধ্যাপক ডা. মাইনউদ্দিন খান বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের হৃদযন্ত্রের সমস্যাও ছিল।
হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের আগস্টে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেকর্ড ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪১৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৯২ জন পুরুষ, ৪০৪ জন নারী ও ৩৭ জন শিশু।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ২২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১, মার্চে ১৪, এপ্রিলে ৯, মে মাসে ২০, জুনে ৪৭, জুলাইয়ে ৩৫০ এবং আগস্টে ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
অর্থাৎ, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৬৯ শতাংশই আগস্ট মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১২ জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে আগস্টে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে চারজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে তা বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে ৩৫০ জন রোগী ভর্তি হওয়ার পর আগস্টে এক লাফে সেই সংখ্যা ৯৬৭ জনে পৌঁছায়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইনউদ্দিন খান।
তিনি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য আইসোলেটেড ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসক, নার্সসহ আলাদা জনবল নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থাপনা টিম কাজ করছে।”
তিনি জানান, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় নতুন চিকিৎসক সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের তত্ত্বাবধানে রোগীদের চিকিৎসা চলছে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিস্থিতি তদারকি করছেন।
ডা. মাইনউদ্দিন খান বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ১৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালটি ১ হাজার শয্যার হওয়ায় রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য জায়গা ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের পুরো অংশকে ডেঙ্গু রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, বর্তমানে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো সংকট নেই।
ডেঙ্গু রোগীর এক স্বজন আব্দুল আলীম বলেন, “হঠাৎ করে জ্বর ও শরীর ব্যথা শুরু হলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এখন চিকিৎসা চলছে। ডেঙ্গু রোগী যেভাবে বাড়ছে, এতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। দ্রুত মশা নিধন ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করা দরকার।”
এদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে হাসপাতালটিতে হাম ও হামের উপসর্গে ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৩ শিশু। মারা গেছে এক বছর বয়সী এক ছেলে শিশু। বর্তমানে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩ হাজার ৬১৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৪৭ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। মারা গেছে ৭১ শিশু।
হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকলেও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় শিশুদের আইসিইউ চালু করা যাচ্ছে না।
আইসিইউর বিকল্প হিসেবে আইসোলেশন ওয়ার্ডে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসায় ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, “হাসপাতালে শিশুদের জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের কারণে সেটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। আইসিইউ না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন চিকিৎসকেরা।”
এসএ




Comments