Image description

মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড কোরের সৈনিক (গানার) তাসনিম রিফাত। দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো এই তরুণ সেনাসদস্যকে বৃহস্পতিবার বাদ যোহর রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিদ্যারামপুর গ্রামে জানাজা শেষে সামরিক ও সামাজিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শেষ বিদায়ের সময় পুরো বিদ্যারামপুর গ্রাম যেন পরিণত হয় শোকের জনপদে। প্রিয় রিফাতকে একনজর দেখতে সকাল থেকেই বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে করে রিফাতের মরদেহ রাজশাহী সেনানিবাসে আনা হয়। পরে সেখান থেকে সড়কপথে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় গ্রামের বাড়ি বিদ্যারামপুরে।

পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মায়ের কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে মাকে হারিয়েছিলেন রিফাত। এবার সেই মায়ের কবরের পাশেই চিরদিনের জন্য শায়িত হলেন তিনি।

শেষ বিদায়ে সামরিক মর্যাদা

বৃহস্পতিবার বাদ যোহর বিদ্যারামপুরে রিফাতের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং বিপুলসংখ্যক গ্রামবাসী অংশ নেন। জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই সেনাসদস্যের শেষ বিদায়ে শোকাহত মানুষের ঢল নামে। শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন স্বজন ও গ্রামবাসী।

ট্যাংকের ভেতর গোলা বিস্ফোরণ

সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং অনুশীলন চলছিল। এ সময় দুর্ঘটনাবশত ট্যাংকের ভেতরে একটি গোলা বিস্ফোরিত হয়। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড কোরের ১৫ স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনের সদস্য সৈনিক (গানার) তাসনিম রিফাতসহ দুই সেনাসদস্য ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। রিফাত চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ১৫ স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনে কর্মরত ছিলেন।

স্ত্রী-শিশুকন্যাকে রেখে না ফেরার দেশে

রিফাতের সংসারে রয়েছেন স্ত্রী ও প্রায় আড়াই বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান। কর্মসূত্রে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে বসবাস করতেন তিনি।

একটি ছোট্ট শিশুর কাছে বাবা আর ফিরবেন না—এ বাস্তবতা এখন পরিবারটির জন্য সবচেয়ে কঠিন। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও যে মানুষটি স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সংসার করছিলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আকস্মিক মৃত্যুতে সেই সংসারেই নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা।

মায়ের শোক কাটতে না কাটতেই ছেলেকে হারালেন বাবা

রিফাতের আকস্মিক মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তাঁর বাবা আসাদুল ইসলাম। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রিফাতের মা। মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই কর্মক্ষম ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটিতে নেমে এসেছে আরেক দফা শোকের ছায়া।

চার ভাইবোনের মধ্যে রিফাত ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বড় ভাই এবি মাহমুদ দীপ্ত এবং ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ বিশাল। স্বজনদের কেউই হঠাৎ করে রিফাতের চলে যাওয়ার খবর মেনে নিতে পারছেন না।

রিফাতের বাবা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘গত কোরবানির ছুটিতে সে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। এরপর নিয়মিত যোগাযোগ হতো। ছেলের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমাদের পরিবারের জন্য এটি অপূরণীয় ক্ষতি।’

বাবার চোখে সন্তানের শেষ বিদায়

স্বজনরা জানান, দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রিফাতের এমন মৃত্যু তাঁদের জন্য গভীর বেদনার। বিশেষ করে স্ত্রী ও ছোট কন্যাসন্তানকে রেখে তাঁর চলে যাওয়া পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। তাঁরা রিফাতের স্ত্রী, কন্যাসন্তান ও পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এদিকে রিফাতের মরদেহ দাফনের সময় পুরো বিদ্যারামপুরে নেমে আসে শোকের আবহ। শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ছুটে আসা মানুষের চোখে ছিল অশ্রু। সামরিক মর্যাদায় দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক তরুণ সেনাসদস্যের জীবনের পথচলা। মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত রিফাত রেখে গেলেন স্ত্রী, ছোট্ট কন্যা, বাবা, ভাইবোন ও স্বজনদের জন্য এক গভীর শূন্যতা।

এসএ