জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারাতে হলো চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার জামাল হোসেনকে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ আফ্রিকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত গুলিতে তিনি নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁর দোকানের এক কর্মচারী গুরুতর আহত হয়ে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত জামাল হোসেন মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়নের সিপাইকান্দি গ্রামের সিধু ব্যাপারীর ছেলে। তিনি স্ত্রী, তিন সন্তান এবং বৃদ্ধ বাবা-মা নিয়ে গঠিত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও উপার্জনের তাগিদে আফ্রিকায় গিয়েছিলেন জামাল। কঠোর পরিশ্রমে সেখানে একটি ভ্যারাইটি সুপারশপ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বুধবার স্থানীয় সময় আনুমানিক রাত সাড়ে ১১টায় একদল সন্ত্রাসী তাঁর দোকানে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুলিতে ঘটনাস্থলেই জামালের মৃত্যু হয়।
এদিকে জামাল হোসেনের মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছালে সিপাইকান্দি এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তাঁর পরিবার। বাবার অকালমৃত্যুতে আট বছর বয়সী বড় সন্তান বায়েজিদ অঝোরে কাঁদলেও, সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়ে সিনথিয়া ও দুই বছর বয়সী সামিরা এখনো মৃত্যুর ভয়াবহতা বোঝার মতো বয়সে পৌঁছেনি।
নিহতের স্ত্রী মাজেদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমার সব শেষ হয়ে গেল। এই ছোট ছোট অবুঝ বাচ্চাদের নিয়ে এখন আমি কোথায় যাব? বিদেশে বাবা মারা গেছে—বড় সন্তান কিছুটা বুঝলেও ছোট দুটো তা-ও বুঝতে পারছে না।"
একই আক্ষেপ ঝরে পড়ে নিহতের বাবা সিধু ব্যাপারীর কণ্ঠে। তিনি বলেন, "সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কেবল এক বাবাই বোঝে। একটু সুখে থাকার জন্য ছেলেটা বিদেশে গিয়েছিল, কিন্তু এখন তো আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।" শত কান্না সামলে মা খুকুমণি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, "আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই; আমি শুধু শেষবারের মতো আমার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। সরকার যেন আমার পোলার লাশটা আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।"
বর্তমানে জামাল উদ্দিনের পরিবার শ্বশুর-শাশুড়ির বাড়িতে অবস্থান করছে। ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম নবী খোকন জানান, নিহত জামাল উদ্দিনের পরিবারটি অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির। তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, "ইউপি সদস্যের মাধ্যমে ঘটনাটি জানার পরপরই দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখানে পরিচিত এক কর্মকর্তার সাথে কথা হয়েছে। নিহতের প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র জমা হলেই লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।"
ডিআর




Comments