ইউএনওর উদ্যোগে জলাবদ্ধতা মুক্ত হলো রায়গঞ্জের ৫ হাজার বিঘা কৃষিজমি
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় পড়ে ছিল প্রায় ৫ হাজার বিঘা কৃষিজমি। বর্ষা মৌসুমে জমিতে পানি জমে থাকত। বছরের বড় একটি সময় অনাবাদি পড়ে থাকত এসব জমি। কৃষকেরা চাইলেও সময়মতো ফসল ফলাতে পারতেন না। তবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায় সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে শুরু হয়েছে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা ইউনিয়নের জগন্নাথপুর ও ঘুড়কা নতুনপাড়া এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ পরিবর্তন এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারীর উদ্যোগ ও সার্বিক সহযোগিতায় স্থানীয় কৃষক ও গ্রামবাসীর অংশগ্রহণে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে পানি জমে থাকত। পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ না থাকায় বছরের পর বছর অনেক জমিতে ঠিকমতো চাষ করা যেত না। বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠত। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন।
জলাবদ্ধতার বিষয়টি জানতে পেরে সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেন ইউএনও মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী। পরে উপজেলা ক্ষুদ্র সেচ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তা আনন্দ বর্মন এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন।
পানি নিষ্কাশনের জন্য স্থানীয় কৃষক ও গ্রামবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে মাটির নিচ দিয়ে ইউপিভিসি পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এ কাজে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নগদ অর্থসহ সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রামবাসীরাও ব্যয়ের একটি বড় অংশ বহন করেন। সব মিলিয়ে এ কাজে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ার পর বদলে গেছে এলাকার চিত্র। সরেজমিনে দেখা যায়, যে জমিগুলো একসময় দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকত, সেখানে এখন ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। কোথাও ধান, কোথাও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ চলছে। জমিতে কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যও বেড়েছে।
জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে পানি জমে থাকায় জমিতে চাষাবাদ করতে পারতাম না। জমি থাকলেও কোনো কাজে আসত না। এখন পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায় ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতে পারছি। এতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে।’
ঘুড়কা নতুনপাড়া এলাকার কৃষক আবদুল আলিম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের এলাকার অনেক জমি জলাবদ্ধ ছিল। এখন পানি নেমে যাওয়ায় জমিতে চাষাবাদ শুরু হয়েছে। আগে যে জমি থেকে কোনো আয় হতো না, এখন সেখান থেকে ফসল পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সবাই এর সুফল পাচ্ছি।’
উপজেলা ক্ষুদ্র সেচ, বিএডিসির কর্মকর্তা আনন্দ বর্মন বলেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয়গুলো বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতা ও কৃষকদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই কাজটি করা হয়েছে। এর ফলে বড় একটি এলাকার কৃষিজমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতা দূর হওয়ায় দীর্ঘদিন অনাবাদি থাকা প্রায় ৫ হাজার বিঘা জমি এখন কৃষি উৎপাদনের আওতায় এসেছে। এসব জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি উপজেলার কৃষি উৎপাদনও বাড়বে।
ইউএনও মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, ‘দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকেরা তাঁদের জমি ব্যবহার করতে পারছিলেন না। বিষয়টি জানার পর স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা কৃষি অফিস ও বিএডিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ কাজে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হয়েছে। গ্রামবাসীরাও বড় একটি অংশের অর্থ দিয়েছেন। প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হয়েছে। এখন প্রায় ৫ হাজার বিঘা জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে।’
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, জলাবদ্ধতা দূর হওয়ায় তাঁদের শুধু ফসল উৎপাদনের সুযোগই তৈরি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তাও কেটে গেছে। আগে অনাবাদি থাকা জমি এখন কৃষকের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি আবারও উৎপাদনের আওতায় আসায় কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে অনাবাদি জমি থেকে যে রাজস্ব সরকার এতদিন পেত না, চাষাবাদ শুরু হওয়ায় সেই হারানো রাজস্বও ফিরে আসবে।
ডিআর




Comments