ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে সাবেক ওসিসহ দুইজন থানায়
সাবেক ওসির বিরুদ্ধে আগের ‘খামকাণ্ড’ও আলোচনায়
সকাল সাড়ে ৭টা। নগরীর নাদের হাজির মোড়ের একটি ফ্ল্যাটের দরজায় এক নারী অনবরত কড়া নাড়ছেন। দাবি—ভেতরে রয়েছেন তাঁর স্বামী। দীর্ঘ সময় ডাকাডাকির পরও খুলছিল না দরজা। একপর্যায়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন তিনি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও দরজা খোলা হয়নি। পরে খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসে। শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢুকে এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও এক নারীকে বের করে আনা হয়। পরে দুজনকেই নেওয়া হয় থানায়।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার নাদের হাজির মোড়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। থানায় নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব আলম ২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন। ওই সময় থানায় বসে এক ব্যক্তির সঙ্গে খাম লেনদেনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তাঁকে ওসি পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
শুক্রবারের ঘটনায় ফ্ল্যাটে থাকা নারী সানজিদা মৌকে মাহবুব আলম নিজের স্ত্রী বলে দাবি করেছেন। তবে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বিয়ের কাবিননামা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেছেন। মাহবুবের ভাষ্য, আন্নিকে চার দিন আগে তালাক দিয়েছেন তিনি। তবে আন্নির দাবি, তালাকের কোনো কাগজ তিনি হাতে পাননি।
আন্নি আক্তারের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জানতে পারেন মাহবুব আলম তাঁর কথিত পালিত মেয়ের নামে ভাড়া নেওয়া একটি ফ্ল্যাটে গেছেন। সেখানে সানজিদা মৌও রয়েছেন। খবর পেয়ে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি নাদের হাজির মোড়ের ওই ফ্ল্যাটে যান। দীর্ঘ সময় দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে চন্দ্রিমা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
আন্নির দাবি, পুলিশ ভেতরে মাহবুব আলমের অবস্থানের বিষয়টি জানতে পারলেও দরজা ভাঙেনি। এরপর তিনি ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। পরে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শুক্রবার দুপুরে তাঁদের থানার পৃথক দুটি কক্ষে রাখা হয়।
আন্নির দাবি, দুই ঘণ্টারও বেশি সময় মাহবুব আলম ও সানজিদা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। পুলিশ ফোন করে দরজা খোলার অনুরোধ করলেও তাঁরা দরজা খোলেননি।
নওগাঁর বাসিন্দা আন্নি আক্তার নিজেকে নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর দাবি, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব আলম তাঁকে বিয়ে করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, মাহবুব বিভিন্ন জেলায় কর্মরত থাকার সময় একাধিক নারীর সঙ্গে বিয়ে বা সম্পর্কের বিষয় রয়েছে।
আন্নির ভাষ্য, রাজশাহীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুবের নিজস্ব একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগেও সেখানে সানজিদা মৌকে মাহবুবের সঙ্গে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তখন সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি প্রকাশ করেননি বলে জানান আন্নি। তবে শুক্রবার নাদের হাজির মোড়ের ওই ফ্ল্যাটে মাহবুবের সঙ্গে সানজিদাকে দেখতে পেয়ে তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। অন্যদিকে মাহবুব আলম দাবি করেন, সানজিদা তাঁর স্ত্রী। তবে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো কাবিননামা দেখাতে পারেননি।
আন্নিকে তালাক দেওয়ার বিষয়ে মাহবুব বলেন, চার দিন আগে তাঁকে তালাক দিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত একটি কাগজ পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে আন্নির বক্তব্য, তালাকের কোনো কাগজ তিনি হাতে পাননি। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
ঘটনার পর আন্নি আক্তার মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেন। শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ লেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে পৃথক কক্ষে রাখা হয়।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌয়ের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মাহবুব আলমের নাম এর আগেও আলোচনায় এসেছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চন্দ্রিমা থানার ওসি থাকাকালে তাঁর সঙ্গে এক ব্যক্তির খাম লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে আরএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
তৎকালীন আরএমপির মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, খামে কী ছিল তা নিশ্চিত নয় এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মাহবুব আলমের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছিল, খামে টাকা ছিল না; এটি একটি ঘটনার নথিপত্র ছিল। ফলে ওই ভিডিওকে ঘিরে অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
পরে মাহবুব আলম নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় বলে শুক্রবারের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তাঁকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়। শুক্রবারের ঘটনার আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে মাহবুব আলমের কর্মস্থল ত্যাগ নিয়ে।
সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ জানিয়েছেন, মাহবুব আলমের রাজশাহীতে যাওয়ার কোনো ছুটি ছিল না। কাউকে জানিয়েও তিনি রাজশাহীতে যাননি।
মোস্তাক আহমেদের ভাষ্য, অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করাও অপরাধ। মাহবুব আলম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে এবং তারা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
ফলে একজন সাবেক ওসিকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে একাধিক প্রশ্ন—অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে তিনি কেন রাজশাহীতে এলেন, ফ্ল্যাটে তাঁর সঙ্গে থাকা নারীকে নিয়ে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সত্যতা কী এবং তাঁর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগগুলোর প্রশাসনিক নিষ্পত্তি কোথায় দাঁড়িয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নতুন ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈবাহিক সম্পর্কের বৈধতা এবং কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর—ঘটনাটির বিষয়ে পুলিশ কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থার সর্বশেষ অবস্থাই বা কী।
এসএ




Comments