কৃষ্ণপুর ট্র্যাজেডির ৫৫ বছর: আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় শহীদদের পরিবার
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ঐতিহাসিক কৃষ্ণপুর গণহত্যার ৫৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হামলায় কৃষ্ণপুর গ্রামে ১২৭ জন বাঙালি হিন্দু নিহত হন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সংবাদসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাটি ‘কৃষ্ণপুর গণহত্যা’ বা ‘কৃষ্ণপুর ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃষ্ণপুর ছিল বৃহত্তর সিলেট জেলার একটি প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল। বর্তমানে গ্রামটি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। লাখাই থানা থেকে গ্রামের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। গ্রামের দক্ষিণে বলভদ্র নদী হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সীমারেখা তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হওয়ায় কৃষ্ণপুরে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার অনেক হিন্দু পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে পৌঁছাতে পারবে না।
তবে ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। বিভিন্ন নথি ও মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের সঙ্গে রাজাকার ও আলবদর সদস্যরা কৃষ্ণপুরে হামলা চালায়। গ্রামবাসীদের আটক করে একত্র করা হয় এবং গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার নথিতেও ১৮ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণপুর, চণ্ডিপুর ও গদাইনগর এলাকায় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ও লুটপাটের অভিযোগের বিবরণ রয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, কৃষ্ণপুরে নিহত ১২৭ জনের মধ্যে ৪৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও তাঁদের অনেকের নাম এখনো সরকারি শহীদ বা মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানানো হচ্ছে।
কৃষ্ণপুরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও সেদিন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় কৃষ্ণপুর, চণ্ডিপুর ও গদাইনগরসহ কয়েকটি স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছিল।
কৃষ্ণপুর গণহত্যার ঘটনায় লিয়াকত আলী ও আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। মামলায় হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও লুটপাটসহ সাতটি অভিযোগ আনা হয়। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।
শহীদদের স্মরণে স্থানীয়দের উদ্যোগে কৃষ্ণপুরে স্মৃতিসৌধ ও বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর সেখানে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কালো পতাকা উত্তোলন, এক মিনিট নীরবতা পালন ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
এ বছরও কৃষ্ণপুর গণহত্যার ৫৫তম বার্ষিকীতে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দারা গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক হাসান বলেন, শহীদদের স্বীকৃতির বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
এসএ




Comments