Image description

"অনেক কষ্ট করে নতুন ভিটায় নতুন ঘর করেছিলাম। কিন্তু মাত্র এক মিনিটের ঝড়ে আমার সব শেষ হয়ে গেল। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই। আমাকে সহযোগিতা করলে খুব উপকার হতো।" কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের গোরকপুর উত্তরপাড়ার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শফিকুল ইসলাম। 

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ভোরের আকস্মিক ঝড়ে তাঁর একমাত্র বসতঘর ও রান্নাঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। উড়ে গেছে টিনের চালা, ভেঙে পড়েছে ঘরের খুঁটি ও বেড়া। মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে গেছে তাঁর স্বপ্নের আশ্রয়স্থল।

রোববার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শফিকুল ইসলামের ঘরের চালার কোনো অস্তিত্ব নেই। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে টিন, কাঠ ও আসবাবপত্র। আকস্মিক এই দুর্যোগে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। পেশায় অটোরিকশাচালক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শফিকুল ইসলাম জানান, শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কঠোর পরিশ্রমে ঘরটি তুলেছিলেন তিনি, যা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হালুয়াঘাট উপজেলার পশ্চিম পাবিয়াজুরী ও গোরকপুর এলাকায় হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় আঘাত হানে। মাত্র কয়েক মিনিটের তাণ্ডবে অঞ্চল দুটির অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও উড়ে গেছে ঘরের চাল, কোথাও আবার গুঁড়িয়ে গেছে বসতঘর ও গোয়ালঘর। উপড়ে পড়েছে শত শত গাছপালা এবং বিদ্যুতের খুঁটি।

একই ঝড়ে শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন গোরকপুর এলাকার বিধবা নারী রাহিলা। আকস্মিক দুর্যোগে ঘর হারিয়ে তিনি অসহায় অবস্থায় সরকারের কাছে সহযোগিতার আকুতি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ঝড়ের সময় ঘরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় চাল উড়ে গিয়ে খুঁটির নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল। তাঁর স্ত্রী রেনুয়ারা জানান, রুবেলকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া পশ্চিম পাবিয়াজুরীর আজি রহমানের বসতঘর ও গোয়ালঘর ভেঙে তাঁর দুই ছেলে আহত হয়েছেন এবং গোয়ালঘরে থাকা গরুর পা কেটে গেছে।

ঝড়ের তণ্ডবলীলা থেকে রক্ষা পায়নি গোরকপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কয়েকটি বড় গাছ ভেঙে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম।

পশ্চিম পাবিয়াজুরীর সুমন চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে গোরকপুর সড়কসহ বিভিন্ন সংযোগ সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে গাছ সরিয়ে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।

এদিকে, গোরকপুর এলাকায় তিনটি ট্রান্সফরমার ও বেশ কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ঝড়ের পর থেকে বিদ্যুৎহীন চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দুর্যোগের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেলের একটি প্রতিনিধি দল এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের পক্ষ থেকে অপর একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ জানান, ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে প্রশাসন সম্পূর্ণ অবগত রয়েছে। সরকারি একটি দল ইতোমধ্যে সরেজমিনে তদন্তে গিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

স্থানীয় ইউপির সাবেক সদস্য মোস্তফা কামাল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ভোরের তাণ্ডব থেমে গেলেও ঘরের চালা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে নিঃস্ব পরিবারগুলো।

ডিআর