Image description

মশারির ভেতর সাদা চাদরে শুয়ে আছে একটি শিশু। ছোট্ট হাতে ক্যানুলা, মুখে দুধের ফিডার। পাশের বিছানায় পাতলা কম্বলে শরীর ঢেকে শুয়ে আছে আরেক শিশু, তার হাতেও ক্যানুলা। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশন ওয়ার্ডের এ দৃশ্য শুধু অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসার চিত্র নয়; সীমিত অবকাঠামোর মধ্যে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের পৃথকীকরণ ও চিকিৎসাব্যবস্থার বাস্তবতাও তুলে ধরে।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রি ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এটি ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালের প্রবেশপথেও ‘৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’ লেখা রয়েছে।

তবে সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের নতুন ভবনে কার্যকরভাবে রোগী রাখার সক্ষমতা ১৯ শয্যায় সীমিত। ফলে রোগীর চাপ সামলাতে পুরোনো ভবনেও চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে হচ্ছে। অনুমোদিত শয্যা ও বিদ্যমান অবকাঠামোর এই ব্যবধানের কারণে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

হাসপাতালের নাগরিক সনদে অন্তর্বিভাগে ভর্তিযোগ্য রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবার কথাও বলা হয়েছে। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী পৃথকীকরণ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু শিশুদের জন্য আলাদা আইসোলেশন সুবিধা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালে শিশুদের জন্য পৃথক কোনো আইসোলেশন ইউনিট নেই। একই আইসোলেশন ব্যবস্থার মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও রোগের ধরন বিবেচনায় পৃথকীকরণ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। একই স্থানে বিভিন্ন বয়স ও বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত রোগীদের রাখার ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত অবকাঠামো ও রোগীর চাপের মধ্যেও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. একরামুল হক মানবকণ্ঠকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে। পুরুষ ওয়ার্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিটের এক পাশে ডেঙ্গু এবং অন্য পাশে হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য শয্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমান সরকারের নতুন পরিকল্পনার আওতায় ১৫১ শয্যার ভবন পাওয়া গেলে সেখানে আলাদা আইসোলেশন এবং হাম, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড থাকবে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য জরিপ ও মাটি পরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ২৪ অনুচ্ছেদে প্রতিটি শিশুর সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য স্বাস্থ্যমান উপভোগের অধিকার স্বীকৃত। অসুস্থতার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবায় শিশুর প্রবেশাধিকারের কথাও এতে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য ১৫-এ শিশুর স্বাস্থ্য অধিকারকে প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, পর্যাপ্ত শয্যা এবং নিরাপদ পরিবেশই তাঁদের প্রধান প্রত্যাশা।

একজন রোগীর স্বজন বলেন, “শিশু অসুস্থ হলে আমরা সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। চিকিৎসা তো অবশ্যই দরকার, কিন্তু অন্য রোগীদের সঙ্গে একই জায়গায় থাকলে সংক্রমণের বিষয়টিও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলে অভিভাবকদেরও স্বস্তি বাড়বে।”

আরেক রোগীর স্বজন বলেন, “ডাক্তার ও নার্সরা চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু জায়গার সংকট থাকলে তাঁদেরও কাজ করা কঠিন। হাসপাতালের জায়গা ও শয্যা বাড়ানো দরকার।”

স্থানীয় বাসিন্দা ইমন হোসেন বলেন, হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হলে এলাকার মানুষ নির্বিঘ্নে সেবা নিতে পারবে। শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড হলে তাদের চিকিৎসাসেবাও আরও কার্যকর হবে।

এসএ