Image description

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সারাদেশের ১০০ জন গুণী শিক্ষককে এক লাখ টাকা করে মোট এক কোটি টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকে ১৪০ জন গুণী শিক্ষকের তালিকা চেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তবে ফেনীতে কলেজ পর্যায়ে গুণী শিক্ষক নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। নির্ধারিত যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন না করে, কমিটির সভা ছাড়াই এবং মাত্র এক কর্মদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে মূল্যায়ন ও বাছাই সম্পন্ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ প্রক্রিয়ায় ছাগলনাইয়া উপজেলার চাঁদগাজী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মোর্শেদ হোসেনকে কলেজ পর্যায়ে জেলার ‘গুণী শিক্ষক-২০২৬’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাঁর নাম প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শিক্ষক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে আবেদন করার সুযোগ, উপজেলা পর্যায়ের বাছাই, জেলা পর্যায়ের যাচাই এবং নির্ধারিত মনোনয়ন কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক শিক্ষক।
গুণী শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিকতা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দক্ষতা, সময় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, গবেষণা ও জার্নালে প্রকাশনা, পত্রিকায় লেখালেখি, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড, সমাজ সংস্কারে অবদান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনার কথা রয়েছে। কিন্তু ফেনীতে এসব সূচকে প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক মূল্যায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষা বিভাগের নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, গুণী শিক্ষক নির্বাচনের বিষয়ে জেলার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক পর্যাপ্ত সময় পাননি। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র এক রাতের নোটিশে আবেদন, যাচাই-বাছাই ও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু ও শেষ করা হয়। ফলে জেলার অনেক যোগ্য ও স্বনামধন্য শিক্ষক বিষয়টি সম্পর্কে জানতেই পারেননি।
নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিঠি পাঠানোর পর শিক্ষকদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার কথা। এরপর উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচিত শিক্ষকদের নাম জেলা পর্যায়ে পাঠানোর কথা। কিন্তু ফেনীতে অনেক শিক্ষক এমনকি উপজেলা পর্যায়ে নিজেদের নাম নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিও জানতেন না বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি নিয়ে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে মনোনয়ন কমিটি গঠনের কথা। কমিটিতে জেলা সিভিল সার্জন, জেলা সদরের সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এবং দুজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে রাখার কথা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ কমিটি গঠন করা হয়নি। এমনকি কমিটির সদস্য হিসেবে থাকার কথা ছিল এমন কর্মকর্তাদের অনেকেই কোনো চিঠি পাননি এবং কোনো সভাতেও অংশ নেননি।
ফেনী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘কোনো চিঠি পাইনি, কোনো মিটিংও হয়নি—মূল্যায়নেও ছিলাম না।’
কলেজ পর্যায়ে ছাগলনাইয়া উপজেলা থেকে মোর্শেদ হোসেন এককভাবে নির্বাচিত হয়ে জেলা পর্যায়ে নাম পাঠানোর বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে পরশুরাম উপজেলা থেকে কলেজ পর্যায়ে কোনো নাম আসেনি বলে জানা গেছে। ফলে ছয় উপজেলার সমন্বিত ও সমান সুযোগের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ছাগলনাইয়ায় মোর্শেদ হোসেন ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থী আবেদন করেছিলেন কি না এবং অন্য শিক্ষকদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
অনুসন্ধানে জেলা শিক্ষা অফিসের নথিতে সোনাগাজী, ফেনী সদর, দাগনভূঞা ও ফুলগাজী উপজেলার কয়েকজন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়, যাদের উপজেলা পর্যায়ে প্রথম দেখিয়ে জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা নিজেদের উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি জানেনই না।
সোনাগাজী উপজেলা থেকে নথিতে সোনাগাজী সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. কে. এম. আতিকুর রহমানের নাম রয়েছে। তবে তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না। তাঁর ভাষ্য, যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি এবং কমিটি ছাড়া নির্বাচন হয়ে থাকলে তিনি পূর্ণমূল্যায়ন চান। তিনি আরও জানান, স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি পিএইচডি, এমফিল ও বিএড সম্পন্ন করেছেন। তাঁর ১৭টি গবেষণা নিবন্ধ, বিভিন্ন পুরস্কার ও স্কলারশিপ রয়েছে এবং বিভিন্ন পত্রিকায় ৩০টি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। 
ফেনী সদর উপজেলা থেকে ফেনী সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন পাটোয়ারীর নাম দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে আবেদনই করিনি। আমি যে উপজেলায় প্রথম হয়েছি, সে বিষয়েও কিছু জানি না।’
দাগনভূঞা উপজেলা থেকে সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক মো. শের আলীর নাম দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, তাড়াহুড়ো করে কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়ে জেলা পর্যায়ে তাঁর নাম যাওয়ার বিষয়টি তিনি জানতেন না।
ফুলগাজী উপজেলা থেকে আলী আজম হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবু তাহের মজুমদারের নাম দেওয়া হয়েছে। তিনিও জানান, কে কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
অন্যদিকে খণ্ডল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে তিনি কোনো চিঠি পাননি। ফলে আবেদন করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর দাবি, এর আগে তিনি দুই দফা প্রথম হয়েছিলেন এবং তাঁর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এবার আবেদন করতে পারেননি। কমিটি গঠন ছাড়া মূল্যায়ন হয়ে থাকলে তিনি পূর্ণমূল্যায়নের দাবি জানান।
ফেনী সরকারি কলেজের প্রভাষক মর্জিনা আক্তারও জানান, তাঁরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং কখন কী হয়েছে, সেটিও তাঁদের জানানো হয়নি।
গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত মোর্শেদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে তাঁর ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা ছিল। তবে সেটি নেওয়া হয়নি। বাকি প্রক্রিয়া শিক্ষা অফিস জানে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ মাউশির সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি বলে জানিয়েছেন নির্বাচিত শিক্ষক নিজেই।
উত্থাপিত অভিযোগ ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বিষয়ে ফেনী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফি উল্লাহ বলেন, সময়-স্বল্পতার কারণে জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষ্য, এক কর্মদিবদের কারণে কমিটি গঠন করা যায়নি এবং মিটিং ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনটি সম্পন্ন করতে হয়েছে। অভিযোগ এলে পূর্ণমূল্যায়নের জন্য বোর্ডে চিঠি পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
ফেনী জেলা কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, কমিটি গঠন না হলে এটি অস্বচ্ছ। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে পূর্ণমূল্যায়ন হওয়া উচিত।
সার্বিক বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবউল করিম বলেন, শিক্ষক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে মতানৈক্যের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
গুণী শিক্ষক নির্বাচনের মতো একটি স্বীকৃতিমূলক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ ও নির্ধারিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কতটা অনুসরণ করা হয়েছে, এখন সেটিই সামনে এসেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজন হলে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন করে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হোক।
এসএ