চসিকের ১৫০ কোটির টার্মিনালেই যানজটের ‘ফাঁদ’!
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর চট্টগ্রাম নগরে চালু হতে যাচ্ছে তৃতীয় বাস টার্মিনাল। উত্তর চট্টগ্রামের যানজট কমাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুলগাঁওয়ে টার্মিনালটি নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। তবে চালুর আগে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক, প্রশস্ত প্রবেশপথ ও সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না থাকায় উল্টো নতুন করে যানজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। টার্মিনালের প্রবেশপথ ঘেঁষে পোশাক কারখানা, স্কুল-কলেজ, বাজার ও মসজিদ থাকায় এমনিতেই ব্যস্ত থাকে সড়কটি। এর সঙ্গে শতাধিক বাস-ট্রাকের চলাচল যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তবে চসিকের যেন এ নিয়ে মাথাব্যাথাই নেই। সংস্থাটি বলছে, ‘আগে চালু হোক, তারপর দেখা যাবে’।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর কথা রয়েছে। তবে টার্মিনাল চালুর আগেই এর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং আশপাশের সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংযোগ সড়ক নেই, সামনের অংশ সংকীর্ণ
কুলগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের পূর্ব পাশে নির্মাণ করা হয়েছে টার্মিনালটি। মহাসড়কের সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণমুখী কোনো আলাদা সংযোগ সড়ক রাখা হয়নি। ফলে টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় বাস-ট্রাককে সরাসরি মূল মহাসড়কে উঠতে হবে। টার্মিনালের সামনের অংশও তুলনামূলক সংকীর্ণ। ফলে বড় যানবাহন মূল সড়কে ওঠানামার সময় যান চলাচলে বাধা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টার্মিনালটিতে একসঙ্গে ১৬০টি বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দূরপাল্লার পাশাপাশি আন্তঃনগর রুটের বাসও এখান থেকে চলাচল করবে। একটি বাসের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬ ফুট এবং ট্রাকের প্রায় ২৮ ফুট হওয়ায় টার্মিনাল থেকে এসব যানবাহন মূল সড়কে ওঠার সময় উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে জায়গা দখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কটি উত্তর-দক্ষিণমুখী। এর পূর্ব পাশে টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও মহাসড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উত্তর ও দক্ষিণমুখী পৃথক কোনো সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়নি। ফলে টার্মিনালে ঢোকা ও বের হওয়ার সময় যানবাহনকে মূল মহাসড়ক ব্যবহার করতে হবে।
টার্মিনালের ভেতরের পূর্ব পাশের সীমানায় একটি বড় বিদ্যুৎ খুঁটিও দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যানবাহনের চলাচলের সময় খুঁটিতে ধাক্কা লাগলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া টার্মিনালের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ প্রশস্ত না হওয়ায় বড় যানবাহন চলাচলের সময় মূল সড়কে চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
কারখানা, স্কুল-কলেজের চাপে ব্যস্ত সড়ক
টার্মিনালের প্রবেশপথ ঘেঁষে রয়েছে তিনটি পোশাক কারখানা। সড়কের অপর পাশে রয়েছে আরও দুটি বড় কারখানা। এসব কারখানায় বিভিন্ন শিফটে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কর্মীদের আসা-যাওয়া এবং কারখানা ছুটির সময় ওই এলাকায় এমনিতেই যানজট তৈরি হয়। রাতের শিফট শেষ হওয়ার সময়ও সড়কে যানবাহনের চাপ থাকে।
শুধু শিল্পকারখানাই নয়, টার্মিনালের কাছেই রয়েছে কুলগাঁও স্কুল ও সিটি করপোরেশন কলেজ। উত্তর দিকে রয়েছে আরও কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয় ও মাদ্রাসা। টার্মিনালের প্রবেশপথে রয়েছে কয়েকটি দোকান ও একটি মসজিদ। এ ছাড়া বালুছড়া এলাকায় সপ্তাহে দুই দিন বসে বাজার। ফলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, বাজারমুখী ক্রেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়মিত চলাচলে সড়কটি ব্যস্ত থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বিদ্যমান এই চাপের সঙ্গে টার্মিনালের কয়েক হাজার যাত্রী ও বিপুলসংখ্যক বাস-ট্রাকের চলাচল যুক্ত হলে বালুছড়া এলাকায় যানজট আরও তীব্র হতে পারে।
বালুছড়া এলাকার বাসিন্দা আবদুল হক বলেন, ‘টার্মিনাল চালু হচ্ছে, এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু টার্মিনালের সামনে ও আশপাশে পাঁচটি পোশাক কারখানা, স্কুল-কলেজ ও বাজার রয়েছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। টার্মিনাল চালু হলে যানজট বাড়তে পারে। তাই আগে থেকেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও টার্মিনালের সামনের সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
পুরোনো সংকট সমাধানেই নতুন টার্মিনাল
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নগরের প্রথম বাস টার্মিনাল নির্মিত হয় ১৯৬৬ সালে কদমতলীতে। এরপর ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয় বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর কুলগাঁওয়ে নির্মিত হচ্ছে নগরের তৃতীয় বাস টার্মিনাল।
হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িমুখী যানবাহনের জন্য এতদিন নির্দিষ্ট কোনো টার্মিনাল ছিল না। ফলে অক্সিজেন মোড়সহ আশপাশের সড়কের ওপর দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকত। এতে ওই এলাকায় যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি ছিল। এই সংকট কমানোর লক্ষ্যেই কুলগাঁওয়ে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় চসিক।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি বাস মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কের অক্সিজেন এলাকা দিয়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বাস চলাচল করে।
নির্মাণ শেষের পথে, বাকি আরও কিছু কাজ
গেল সোমবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালের টিকিট কাউন্টার ও রেস্টুরেন্ট ভবনে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। টিকিট কাউন্টার ভবনের সামনে লোহার শেড নির্মাণের কাজ চলছিল। এ ছাড়া টার্মিনালের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাশের সীমানাপ্রাচীর এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কিছু কাজও বাকি রয়েছে।
নির্মাণকাজের তদারকিতে থাকা মাসুদ আলম বলেন, লোহার শেড, টাইলসসহ বিভিন্ন ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। সীমানাপ্রাচীরসহ আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এসব কাজ শেষ হতে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে।
‘ইউ-লুপ না হলে যানজট বাড়তে পারে’
চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান বলেন, ‘উত্তর চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে বাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। তবে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই হবে না, এর সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনাও পরিকল্পিতভাবে করতে হবে।’
তাঁর মতে, টার্মিনালটি সড়কের পূর্ব পাশে হওয়ায় বাসগুলো প্রবেশ করতে পারলেও বের হওয়ার সময় মূল সড়কের সংকীর্ণতা ও পর্যাপ্ত এক্সিট ব্যবস্থার অভাবে যানজট তৈরি হতে পারে। এ জন্য টার্মিনালের সামনে পরিকল্পিত ইউ-লুপ বা ইউ-টার্ন ব্যবস্থা করা জরুরি। জনদুর্ভোগ তৈরি হওয়ার আগেই সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম ট্রাফিকের টিআই অ্যাডমিন (উত্তর) এ.বি.এম. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অক্সিজেন জোনে বর্তমানে ছয়জন সার্জেন্ট ও ছয়জন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করছেন। টার্মিনাল চালু হলে একই টিমকে বালুচড়া এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হবে। যেখানে ১২ সদস্যের একটি টিম দিয়েই বর্তমান ট্রাফিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন, সেখানে টার্মিনাল চালুর পর অতিরিক্ত মানুষের সমাগম হলে যানবাহনের চাপও বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যবস্থা বজায় রাখা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’
‘আগেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার’
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, টার্মিনাল চালুর আগে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক প্রশস্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এলাকাটিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত রয়েছে। এর সঙ্গে টার্মিনালে আসা বাস, ট্রাক ও যাত্রীদের চাপ যুক্ত হলে যানজটের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই টার্মিনাল চালুর সঙ্গে সঙ্গেই যানজট নিরসনের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা দরকার।
‘বড় স্থাপনার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি’
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, কোনো বড় স্থাপনা নির্মাণের আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আশপাশের সড়ক ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, টার্মিনাল নির্মাণের আগে জমি অধিগ্রহণ, প্রবেশপথ ও সড়ক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সমাধান করা উচিত ছিল। বর্তমানে যে এলাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন, সেখানে নতুন করে টার্মিনালের যানবাহন যুক্ত হলে সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
চসিক বলছে—‘চালুর পর সমস্যা দেখা গেলে ব্যবস্থা’
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান বলেন, উত্তর চট্টগ্রামের যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী মাসে এটি চালুর আশা করা হচ্ছে।’
টার্মিনালের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, আশপাশের কারখানা এবং অন্যান্য স্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টার্মিনাল চালুর পর কোনো সমস্যা দেখা দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু জমি অধিগ্রহণ এখনও বাকি রয়েছে। সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই টার্মিনালটি চালু হোক। এখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের বিষয়ও রয়েছে। চালুর পর সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে খুঁটিটি সরানোর ব্যবস্থা করা হবে।’
এসএ




Comments