প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব ও স্মার্টফোনের আসক্তি থেকে শিশুদের দূরে রেখে দেশীয় সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংগঠনটির উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৯টি ‘গুরুগৃহে’ এখন লালনচর্চায় মেতে উঠেছে ছয় শতাধিক শিশু। ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় কমিয়ে শিশুদের আত্মশুদ্ধি, নৈতিক শিক্ষা ও লোকসংগীতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এসব গুরুগৃহে নিয়মিত সংস্কৃতিচর্চা চলছে।
প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিন শুক্রবার ও শনিবার স্কুলের পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে মায়ের তরীর গুরুগৃহগুলোতে।
সরেজমিনে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম সিংহীমারীর গুরুগৃহে গিয়ে দেখা যায়, সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রের আঙিনায় চটি বিছিয়ে বসে আছে একদল শিশু। তাদের হাতে একতারা, দোতরা, সারিন্দা, বাঁশি, খমক, তবলা ও বেহালা। নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো আঙিনা। শিশুদের কণ্ঠে ভেসে আসছে লালনের অমর সৃষ্টি—‘মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে’ কিংবা ‘আমার ঘরখানাতে কে বিরাজ করে’।
শুধু ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানো নয়, এসব গুরুগৃহে শিশুদের শেখানো হচ্ছে লালনগীতি, মারফতি, মুর্শিদী, পল্লীগীতিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক গান। পাশাপাশি সহজ ভাষায় তাদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে লালন দর্শনের মূল ভাবধারা।
লালন দর্শনের মাধ্যমে জাত-পাতের বিভেদ ভুলে মানুষ হয়ে ওঠা, নিজেকে চেনা এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির বন্ধন উপলব্ধির মতো বিষয়গুলো শিশুদের মধ্যে তুলে ধরা হচ্ছে। লালন দর্শন ও লোকসংগীতের চর্চায় প্রান্তিক অঞ্চলের এসব শিশু খুঁজে পাচ্ছে আত্মতৃপ্তি ও সৃজনশীলতার নতুন পথ।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন নরওয়ের নাগরিক, কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথের। বাংলাদেশে ভ্রমণের সময় এ দেশের মানুষের লোকসংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও লালনের প্রতি অনুরাগে মুগ্ধ হয়ে তিনি শিশুদের জন্য ‘মায়ের তরী’ প্রতিষ্ঠা করেন।
উয়েরা সেথের জানান, বাংলাদেশের মানুষের লোকসংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাকে অভিভূত করেছে। শিশুদের মধ্যে লালনসংগীত ও দর্শনের চর্চা তাদের সুন্দর ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমানে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পরিচালিত ৯টি ‘গুরুগৃহ’ লোকগানের নিয়মিত চর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে এসব কেন্দ্রে শিশুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও সংগীতচর্চায় মুখর হয়ে ওঠে গ্রামীণ পরিবেশ।
সন্তানদের প্রযুক্তিনির্ভরতা ও অতিরিক্ত স্ক্রিন-সময়ের বাইরে এনে দেশীয় শেকড় ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে দেখে আনন্দিত স্থানীয় অভিভাবকরাও। তাদের ভাষ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি এ ধরনের সংস্কৃতিচর্চা শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক গুণাবলি বিকাশে ভূমিকা রাখছে।
এসএ




Comments