Image description

মাচায় লাউ চাষ ও আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচর্যার মাধ্যমে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন পটুয়াখালীর লোহালিয়া এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা মোহাম্মদ দুলাল প্যাদা। ধান চাষের পাশাপাশি গত দেড় দশক ধরে সবজি উৎপাদন করে তিনি এখন একজন সফল ও আদর্শ কৃষক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সাফল্যে স্বাবলম্বী হয়েছে পরিবার, পাশাপাশি অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এলাকার বেকার যুবক ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা।

পটুয়াখালীর লোহালিয়া এলাকাটি ‘সবজি ভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার উৎপাদিত সবজি জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। সুস্বাদু ও মানসম্মত সবজি উৎপাদনের জন্য এলাকাটির রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সবজি চাষই তাঁদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

পটুয়াখালী জেলা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত লোহালিয়া নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত লোহালিয়া ইউনিয়ন। পটুয়াখালী সদর উপজেলার এ ইউনিয়নটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩০ সালে। ২৫ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস এ ইউনিয়নে। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার বাসিন্দারা বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ ইউনিয়নের পাজাখালী গ্রামেই গড়ে উঠেছে কৃষি উদ্যোক্তা দুলাল প্যাদার মাচায় লাউ চাষের খামার।

দুলাল প্যাদা পেশায় একজন কৃষক। পৈতৃক পেশাকে আঁকড়ে ধরে ধান চাষের পাশাপাশি প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে তিনি সবজি উৎপাদন করছেন। মাচায় লাউ চাষের পাশাপাশি শসা, কাঁচা মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করেন। এলাকার কৃষকদের সাফল্য দেখে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর গড়ে তোলেন নিজের সবজির খামার। বর্তমানে দুই ছেলে জহিরুল ইসলাম ও আরিফ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালনা করছেন কৃষিকাজ।

দুলালের বড় ছেলে জহিরুল ইসলাম পটুয়াখালী করিম মৃধা কলেজে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে আরিফ হোসেন ২০২৬ সালে লোহালিয়া এলাকার একটি মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি দুই ভাই বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করছেন। উৎপাদিত সবজি বিক্রির আয় থেকে সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি নিজেদের লেখাপড়ার খরচও জোগান দিচ্ছেন তাঁরা। কৃষিকাজের আয়েই মা, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে স্বচ্ছন্দে দিন কাটছে দুলাল প্যাদার।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লোহালিয়া ইউনিয়নে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর। এর মধ্যে পাজাখালী ও পালপাড়া এলাকায় রয়েছে ২৯৪ হেক্টর জমি। ইউনিয়নটিতে মোট ১১৫ হেক্টর জমিতে সবজি আবাদ হয়। চলতি মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মাচায় লাউ চাষ হয়েছে ১৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ৫ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ করেছেন দুলাল প্যাদা। তিনি বছরে দুই মৌসুমে—গ্রীষ্ম ও শীতকালে—বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করেন। এ ইউনিয়নে প্রতি মৌসুমে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার সবজি উৎপাদিত হয়। এর সিংহভাগই আসে পালপাড়া ও পাজাখালী গ্রাম থেকে।

দুলাল প্যাদা বলেন, “১৪-১৫ বছর ধরে ধান চাষের পাশাপাশি সবজি উৎপাদন করছি। প্রতি বছর প্রচুর লাউ উৎপাদন হয়। এতে খরচ তুলনামূলক কম, লাভও বেশি। বলতে গেলে, ধান চাষের তুলনায় লাউ চাষে প্রায় দ্বিগুণ লাভ হয়। এ কারণে বছরে দুই মৌসুমে লাউ চাষ করছি। এলাকার কৃষকদের সাফল্য দেখে সবজি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাচায় লাউ চাষের খামার গড়ে তুলেছি। এতে ভালোই লাভবান হচ্ছি। আমার সাফল্য দেখে এলাকার আরও অনেকে এ ধরনের সবজির খামার করেছেন। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছি।”

দুলালের দুই ছেলে জহিরুল ইসলাম ও আরিফ হোসেন বলেন, “আমরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করি। লাউসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করে সংসারের ব্যয় মেটানো হচ্ছে, পাশাপাশি আমাদের লেখাপড়ার খরচও জোগান হচ্ছে। খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় আমরা উৎসাহ পাচ্ছি। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। আমাদের লাউয়ের খামার দেখে এলাকার অনেকেই কৃষি উদ্যোক্তা হয়েছেন এবং সবজি উৎপাদনে এগিয়ে আসছেন।”

লোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জুলফিকার বলেন, “দুলাল প্যাদা দীর্ঘদিন ধরে লাউসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করছেন। কৃষিকাজ করেই তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। একসময় তাঁর পৈতৃক জমিজমা ছিল না। কৃষিকাজের আয়েই এখন বাড়িতে পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন এবং দুই ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার আরও অনেকে সবজি চাষে আগ্রহী হয়েছেন।”

লোহালিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম সোয়েব বলেন, “কৃষি উদ্যোক্তা দুলাল প্যাদা একজন সফল ও আদর্শ কৃষক। তিনি বহু বছর ধরে এলাকায় সবজি উৎপাদন করছেন। বর্তমানে মাচায় লাউসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে ভালো লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাবা ও দুই ছেলে মিলে খামারটি পরিচালনা করছেন। এ খামারের আয় থেকেই দুলালের সংসার চলে এবং দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ মেটে।”

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, “লোহালিয়ায় বছরজুড়েই সবজি উৎপাদন হয়। জেলা শহরের সবজির চাহিদার একটি বড় অংশ এখান থেকে পূরণ করা হয়। কৃষক দুলাল প্যাদা একজন আধুনিক ও সচেতন কৃষক। তাঁর লাউয়ের বাগানে উৎপাদিত সবজি নিরাপদ ও সুস্বাদু রাখতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি যেমন নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারছেন, তেমনি ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ সবজি উৎপাদনেও ভূমিকা রাখছেন।”

দুলাল প্যাদার এই সাফল্য শুধু একটি পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জনের গল্প নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির সম্ভাবনা, পারিবারিক উদ্যোগ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। তাঁর দেখানো পথে এলাকার আরও মানুষ সবজি চাষে এগিয়ে এলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এসএ