দেড় বছর উধাও থেকেও ঘরে বসে রেলে বেতন!
বাসায় হাজিরা খাতা পাঠিয়ে স্বাক্ষর সংগ্রহ
জুলাই আন্দোলনের পর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মস্থলে দেখা মেলেনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের দুই কর্মচারীর। একজন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি, অন্যজন সিআরবির জোড়া খুন মামলার আসামি। রেলওয়ের নথিতে তারা দীর্ঘ ১৮ থেকে ২০ মাস পলাতক। কিন্তু হঠাৎ করেই রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হাজিরা খাতায় পড়ছে তাদের স্বাক্ষর, পকেটে ঢুকছে বেতন-ভাতাও। অফিসে না এসেই কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ও বাসায় হাজিরা খাতা পাঠিয়ে হাজিরা নিশ্চিত করা হয় একজনের।
এমনই নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম দপ্তর এবং ঋণদান সমিতিতে। নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ও সিআরবির ডাবল মার্ডারের চিহ্নিত চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনিক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ভুয়া চিকিৎসাপত্রে ছুটি মঞ্জুর ও নিয়মিত বেতন তুলে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করছে রেলওয়ের প্রভাবশালী এক পুরোনো সিন্ডিকেট।
জোবায়েরের উধাও নাটক
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম দপ্তরের অফিস সহকারী জোবায়েরুল ইসলাম ২০২২ সালে রেলের চাকরি গোপন রেখে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। তার বাবা সিরাজুল ইসলাম ছিলেন রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, যার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যা মামলা রয়েছে। বাবার প্রভাবে গত আওয়ামী সরকারের আমলে অফিসে না এসে ব্যক্তিগত কাজ চালানো জোবায়ের ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন।
দপ্তরটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত টানা সাত মাস সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন তিনি।
আইন অনুযায়ী দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তার চাকরিচ্যুত হওয়া ও বেতন বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সরঞ্জাম বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সাত মাসের অনুপস্থিতিকে ঢাকার একটি হাসপাতালের ‘ভুয়া চিকিৎসাপত্র’ বানিয়ে এককালীন অসুস্থতার ছুটি হিসেবে মঞ্জুর করায় বিভাগ। পরে ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস) জটিলতায় ওই সাত মাসের অর্থ আটকে গেলেও বিগত ৫ মাস ধরে তিনি দপ্তরে না এসেও নিয়মিত বেতন-ভাতা পকেটে পুরছেন।
ঋণদান সমিতিতে সিআরবি জোড়া খুনের আসামি
একই চিত্র দেখা গেছে রেলওয়ে ঋণদান সমিতিতে। ২০১৩ সালের ২৪ জুন সিআরবির চাঞ্চল্যকর ডাবল মার্ডার মামলার ৪৪ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী সাইফুল আলম লিমনের ক্যাডার মনিরুজ্জামান দিনার ছিলেন সমিতির পিয়ন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিআরবি, কদমতলী, টাইগারপাস এলাকায় চাঁদাবাজি, রেলের বাসা দখল ও মাস্তানির অভিযোগ থাকা দিনার ২০২৪ সালের পর প্রায় দেড় বছর উধাও ছিলেন। অথচ হঠাৎ করেই তাকে চাকরিতে পুনর্ধাল করেন পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক ও সমিতির তৎকালীন প্রশাসনিক প্রধান মোস্তফা জাকির হাসান। এমনকি তিনি উধাও থাকা সময়ের বিপুল পরিমাণের বেতন-ভাতাও তুলে নিয়েছেন।
সিন্ডিকেটের মূল কারিগর সাখাওয়াত
এই দুই অভিযুক্তকে উধাও থাকার পরও চাকরিতে বহাল রাখা ও বেতন তুলে দেওয়ার মূল সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে সমিতির সচিব সাখাওয়াত হোসেনের নাম। স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, শ্রমিক লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম একসময় ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ তৈরি করে সাখাওয়াতকে সমিতির সচিব পদে বসিয়েছিলেন। সিরাজের অনুগ্রহে চাকরি পাওয়ার সেই ‘ঋণ’ শোধ করতেই তার ছেলে জোবায়ের ও ক্যাডার দিনারকে ব্যাকডেটে হাজিরা ও বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন সাখাওয়াত। এছাড়া সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ ও সমিতির ৩০ লাখ টাকার জমি এক কোটি টাকা দেখিয়ে ৪০ লাখ টাকা পকেটে পুরে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘চাকরিতে যোগদানের সময় পুলিশি তদন্ত হয়েছে। আমি কোনো জমি কিনিনি, সমিতির জমি কেনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা সব তথ্যই মিথ্যা।’
প্রশাসনের সাফাই ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
অনুপস্থিত কর্মচারীর বাসায় হাজিরা খাতা পাঠাবার বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক রাশেদ ইবনে আকবর। তিনি বলেন, ‘জোবায়ের ইসলাম অফিসে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন এবং নিয়ম মেনেই বেতন-ভাতা তুলছেন। তিনি অসুস্থতার কারণে সাত মাস অনুপস্থিত ছিলেন এবং ছুটির আবেদন করেছেন। নথিপত্রের কিছু ত্রুটির কারণে ওই সময়ের বেতন আটকে আছে, যা হিসাব বিভাগ দেখছে। বাসায় খাতা পাঠিয়ে সই নেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ পরে তিনি অন্য এক কর্মকর্তার মাধ্যমে জোবায়েরের ছুটির নথিপত্র দেখান। অন্যদিকে, পিয়ন দিনারকে ফেরত আনা ও ঋণদান সমিতির সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এসএ




Comments