Image description

সমবায় বিভাগের যেন এক অঘোষিত ‘অধিপতি’ মো. রাশেদুল আলম। সরকারি চাকরির বদলি আইন বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে টানা সাড়ে ১৭ বছর ধরে একই বিভাগে এবং সাড়ে ৪ বছর ধরে একই কার্যালয়ে যেন তার ‘রাজত্ব’। ভুয়া ঠিকানায় কোটায় চাকরি বাগানো থেকে শুরু করে জালিয়াতির অডিট রিপোর্ট বানিয়ে সমিতি থেকে মাসোহারা আদায়—সবই করেছেন তিনি। এমনকি সহকর্মীকে বদলি ও পদোন্নতির প্রলোভনে ফেলে সাড়ে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এখন তার নামে ঝুলছে আইনি নোটিশ!

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, জনস্বার্থে যে কোনো সময় যে কোনো কর্মচারীকে বদলি করার পূর্ণ এখতিয়ার কর্তৃপক্ষের রয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পদায়ন ও বদলি নির্দেশিকায় মাঠপর্যায়ে একজন কর্মকর্তার সর্বোচ্চ কর্মকাল তিন বছর এবং দুর্গম বা পার্বত্য অঞ্চলে দুই বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

অথচ রাশেদুল আলমের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এই শৃঙ্খলা তো দূরের কথা, কোনো নিয়মই কার্যকর হয়নি। চট্টগ্রাম জেলা ও নগর সমবায় কার্যালয়ের বিভিন্ন পদে ঘুরেফিরে সাড়ে ১৭ বছর ধরে বহাল আছেন তিনি, যার মধ্যে নগরের ডবলমুরিং থানাতেই কাটাচ্ছেন সাড়ে চার বছর।

ঠিকানা গোপন ও কোটা জালিয়াতি

দাপ্তরিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মো. রাশেদুল আলমের পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ১০২৮ চণ্ডালখিল এলাকায়। তার বাবা মো. আইয়ুব সরকার সিলেট জেলায় ক্যাশ সরকার হিসেবে কর্মরত থেকে চাকরি থেকে অবসরে যান।

অভিযোগ রয়েছে, বাবার কর্মস্থলের সুযোগে সিলেট জেলা কোটার সুবিধা বাগাতে নিয়োগের সময় নিজের আসল স্থায়ী ঠিকানা গোপন করেন রাশেদুল। সিলেটের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ২০০৪ সালের ৩ অক্টোবর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে এমএলএসএস (বর্তমানে অফিস সহায়ক) পদে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ী হলে নিজের সার্ভিস বুকে ঠিকানা সংশোধন করে সিলেটের সদর উপজেলার সুবিদ বাজার এলাকা উল্লেখ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বাবা স্থায়ীভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে যান।

চাকরির ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের ৫ মার্চ পদোন্নতি পেয়ে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা সমবায় কার্যালয়ে যোগ দেন রাশেদুল। এরপর ২০২২ সালের ১৭ মে সহকারী পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়ে নগরের ডবলমুরিং থানা সমবায় কার্যালয়ের দায়িত্ব নেন।

সমিতি বাণিজ্য ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন

অভিযোগ রয়েছে, নতুন সমবায় সমিতির প্রাথমিক নিবন্ধন, নবায়ন ও সমিতির নামে ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি করে প্রতিবছর বিভিন্ন সমিতির লোকজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন রাশেদুল আলম।

পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতেরও লিখিত অভিযোগ উঠেছে। বদলি ও পদোন্নতির কথা বলে সাড়ে ছয় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হোসাইন আহমেদ শিপনের মাধ্যমে রাশেদুলকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন খোদ সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা সমবায় অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক শুভাংশু চক্রবর্তী।

তাঁতী লীগ নেত্রীর ছেলে বাবলা দাশের সঙ্গে ‘সিন্ডিকেট’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশেদুল আলমের এই অপকর্ম ও আর্থিক লেনদেনের মূল নেপথ্য কারিগর রাজবাড়ী জেলা সমবায় কার্যালয়ে কর্মরত সাবেক উচ্চমান সহকারী বাবলা দাশ গুপ্ত। এই বাবলা কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা তাঁতী লীগের আলোচিত সভাপতি সাধনা দাশ গুপ্তের বড় ছেলে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের 'আশীর্বাদে' সমবায় বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেন বাবলা দাশ। তিনি তার মা সাধনা দাশ গুপ্ত এবং বোন লিপিকা দাশ গুপ্তকে ক্ষমতার জোরে পর্যায়ক্রমে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় শিল্প সমিতি লিমিটেড’-এর সভাপতি বানিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাবলা দাশ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কক্সবাজার জেলা যুবদলের সভাপতি অ্যাডভোকেট ছৈয়দ আহমদ উজ্জল সমবায় সচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগ তদন্তে অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক আবদুল্লাহ আল মামুনকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও দীর্ঘদিনে তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।

ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. রাশেদুল আলম বলেন, 'আমার বাবা সিলেটে ৪০ বছর চাকরি করেছেন, আমি সেখানেই বড় হয়েছি। যে এলাকায় মানুষ বড় হয়, সেখান থেকেই আবেদন করা স্বাভাবিক বলে আমি মনে করি। এ সংক্রান্ত হাইকোর্টের একটি রিটও রয়েছে।' তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থায়ী ঠিকানার প্রশ্নে তার সাফাই, ‘আমার বাবা চাকরি শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে গেছেন, তাই ঠিকানা সংশোধন করা হয়েছে।’

একই দপ্তরে সাড়ে চার বছর ধরে বহাল থাকা ও টাকা লেনদেনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, শুধু তিনিই নই, একই দপ্তরে তার চেয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনেকে আছেন। তিনি বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।'

দীর্ঘদিন একই দপ্তরে বহাল থাকার বিষয়ে নজর দেওয়া হলে সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাহবুবুল হক হাজারী বলেন, ‘তিনি একা নন, তার চেয়েও বেশি সময় ধরে একই কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন এমন অনেকে রয়েছেন। বদলি ও পদায়নের বিষয়টি সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখভাল করেন। তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।’

সমিতিগুলোর ভুয়া রিপোর্ট ও আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক নিবন্ধনের বিষয়টি জেলা সমবায় দপ্তর যাচাই করে। উপজেলা দপ্তরগুলোও তথ্য সংগ্রহ করে। সমিতির কাগুজে অস্তিত্ব বা কার্যক্রম আছে কি না, তা তদারকি করে নিয়মিত প্রতিবেদন বোর্ডে পাঠানো কর্তৃপক্ষের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’

এসএ