Image description

আশার আলো নিয়ে সাগরে গিয়েছিলেন জেলেরা। কিন্তু শুঁটকি মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ায় তাঁদের সেই স্বপ্নে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সুন্দরবনের দুবলার চরে এবার শুঁটকি মৌসুম শুরু হয়েছে দুর্যোগের মধ্য দিয়ে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও টানা বৈরী আবহাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন প্রায় ৪০ হাজার জেলে ও বাওয়ালি। বন্ধ রয়েছে মাছ ধরা, মাচায় শুকাতে দেওয়া মাছ নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট।

দুবলার বিস্তীর্ণ বালুচরে সারি সারি বাঁশের মাচা। যেখানে শত শত মণ লইট্যা, ছুরি, রূপচাঁদা ও ফাইস্যা মাছ শুকানোর কথা, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি মাচায় কিছু মাছ ঝুলছে। আকাশ মেঘলা, বাতাসে ভেজা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। জেলেরা মাচার পাশে বসে অপেক্ষা করছেন রোদের। কখন আকাশ পরিষ্কার হবে, কখন শুকাবে মাছ—সেই আশাতেই দিন কাটছে তাঁদের। সব মিলিয়ে এবারের শুঁটকি মৌসুমের শুরুতেই দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

দুবলা শুধু একটি চর নয়, এটি বাংলাদেশের শুঁটকি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সুন্দরবনের আলোরকোল, হলদিখালী, মাঝেরকেল্লা, মেহেরআলী ও দুবলার চর—এই পাঁচটি চরে প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস চলে শুঁটকি উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ। এ সময় প্রায় ১ হাজার ২০০টি অস্থায়ী ঘর ও ১০ হাজারের বেশি শুঁটকি তৈরির মাচা স্থাপন করা হয়। প্রতিবছর এসব চরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

এ শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করেই নভেম্বরে বসে প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা। এতে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষের সমাগম ঘটে।

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল হোসেন বলেন, “আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ জেলে মহাজনের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিয়ে দুবলায় এসেছেন। ট্রলার ভাড়া, জাল, বরফ ও খাবার—সবকিছুই বাকিতে নেওয়া হয়েছে। মৌসুমের প্রথম ১৫ দিনেই আমাদের মূলধন উঠে আসার কথা ছিল। কিন্তু গত ৭-৮ দিন ধরে সাগর এতটাই উত্তাল যে কোনো নৌকাই মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারেনি।”

আলোরকোলে অবস্থানরত জেলে রহমত মাঝি (৫৫) বলেন, “যে কয়টা মাছ ধরতে পেরেছি, রোদ না থাকায় সেগুলো শুকাতে পারছি না। লইট্যা মাছ খুব নরম। এক দিন রোদ না পেলেই পচে যায়। আমার মাচায় প্রায় ৩ মণ মাছ পচে গেছে। এতে প্রায় ৬০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।”

টানা বৃষ্টিতে দুবলার নিচু এলাকার অস্থায়ী ঘরগুলোতে হাঁটুপানি জমেছে। রান্নার চুলা জ্বলছে না। শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন জেলেরা। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। অনেকে ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হলেও সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা কিংবা মেডিকেল টিমের ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন জেলেরা।

দুবলা ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, সাগর শান্ত না হওয়া পর্যন্ত গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

মোংলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা দৈনিক মানবকণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলেদের দাবি, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে মৌসুমের সময়সীমা বাড়ানো হোক। পাশাপাশি সংকটকালীন সময়ে সরকারিভাবে জরুরি ভিত্তিতে চাল, সুপেয় পানি ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হোক।

জেলেদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মৌসুমের শুরুতেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তাঁরা। এতে বিপাকে পড়বে হাজার হাজার জেলে পরিবার।

এসএ