যত্রতত্র পার্কিং ও অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলে নাকাল নাগরিক জীবন
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জনপদ পটিয়া পৌরসভায় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে যানজট। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, সড়কে অবৈধ দখল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো মানুষ। বিশেষ করে পটিয়া সদরের প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্র।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ব্যস্ততম ডাকবাংলো মোড়, পটিয়া থানা মোড়, ক্লাব রোড, বাসস্টেশন ও সবুর রোড এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগে থাকে। ব্যস্ত সময়ে সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও স্বাভাবিকের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি সময় লাগছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে যাতায়াতের সড়কগুলোতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার জটলা লেগে থাকে। ফলে অ্যাম্বুলেন্সসহ রোগীবাহী যানবাহনও প্রায়ই যানজটে আটকা পড়ে।
এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জরুরি অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে যদি আধা ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়, তাহলে রোগীর জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়ে।”
ভোগান্তি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরাও। পটিয়া সরকারি কলেজ, আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয় ও পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন যানজটের কারণে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার দিনেও যানজটের আশঙ্কায় অনেক আগে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। সড়কের এমন বিশৃঙ্খলা তাঁদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে যানজটের জন্য একে অপরকে দায়ী করছেন বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা। তাঁদের অভিযোগ, সড়কের ওপর দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সিএনজিচালকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স বা রুট পারমিট ছাড়াই অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশা বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। মোড়ে মোড়ে এসব যানবাহনের অবস্থান ও যত্রতত্র চলাচলের কারণে যানজট বাড়ছে।
যানজট নিরসনে পটিয়া ট্রাফিক জোনের ইনচার্জ, পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যান) মো. আমীর ফারুক জানান, তাঁদের দপ্তরে জনবল সংকট রয়েছে। পুরো এলাকায় দায়িত্ব পালনের জন্য মাত্র সাতজন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন টিএসআই, দুজন এটিএসআই ও চারজন কনস্টেবল। এত বড় এলাকায় সীমিত জনবল দিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি আরও জানান, সড়কের ওপর দোকানপাট বসানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং নির্দিষ্ট গাড়ির স্ট্যান্ড ও যাত্রী ওঠানামার জায়গা না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান জানান, যানজটের বিষয়টি তাঁর নজরে রয়েছে। যানজট নিরসনে একাধিকবার সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। জনদুর্ভোগ কমাতে শিগগিরই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বাসিন্দাদের দাবি, পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ বা কমিউনিটি পুলিশ মোতায়েন নেই। পাশাপাশি নির্দিষ্ট বাস টার্মিনালের বাইরে অন্যান্য যানবাহনের জন্য আলাদা স্ট্যান্ড না থাকায় যানজট দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর মতে, পটিয়ার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা সমাধানে শুধু সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পিত ও স্থায়ী উদ্যোগ। তাঁরা ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সড়ক সম্প্রসারণ, নির্ধারিত পার্কিং স্পেস ও যানবাহনের স্ট্যান্ড নির্মাণ এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পটিয়ার যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এসএ




Comments