Image description

ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। অথচ নোয়াখালীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের সরবরাহ নেই। বাজারে যে পরিমাণ ইলিশ আসার কথা, তার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। ফলে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে রুপালি ইলিশ। বর্তমানে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে জাতীয় মাছ ইলিশ।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকাসহ ছোট মাছ নির্বিচারে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি মা ইলিশ নিধন ও ছোট ইলিশ বড় হওয়ার আগেই ধরে ফেলার কারণে নদীতে ইলিশের পরিমাণ কমছে। ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ইলিশঘাট হিসেবে পরিচিত চেয়ারম্যানঘাটে প্রতিদিন ভোর হলেই নদী থেকে মাছ নিয়ে ফিরতে থাকে অসংখ্য নৌকা। এরপর শুরু হয় মাছ নামানো, বাছাই, নিলাম ও বেচাকেনার ব্যস্ততা। প্রতিদিনের এই চিত্র চেয়ারম্যানঘাটের চিরচেনা দৃশ্য হলেও ইলিশের ভরা মৌসুমে এবার সেই ব্যস্ততা অনেকটাই কমে গেছে।

আড়তে কমেছে ইলিশের সরবরাহ। মাছের ঝুড়িও আগের তুলনায় কম। বাজারে ইলিশের দেখা মিললেও দাম চড়া। ফলে চড়া দামের কারণে অনেক ক্রেতাই ইলিশ কিনতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট আকারের ইলিশ কিনছেন, আবার কেউ ইলিশের পরিবর্তে অন্য মাছ বেছে নিচ্ছেন।

নোয়াখালী জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরণ করা হয়। তবে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষের এই জেলায় অধিকাংশ মানুষেরই বর্তমানে ইলিশ কেনার সামর্থ্য নেই। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত দুই বছরের তুলনায় এবার ইলিশের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

ভরা মৌসুমেও মেঘনা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় হতাশ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও এ সময়ে বাজারে ইলিশের সরবরাহ ছিল বেশি। হাজার হাজার ক্রেতার সমাগমে মুখর থাকত চেয়ারম্যানঘাটের মাছের আড়ত। এখন মাছ কমে যাওয়ায় ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে।

আড়তদারদের অভিযোগ, ইলিশ সংকটের অন্যতম কারণ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা। এসব জালে জাটকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলে ছোট ইলিশ বড় হওয়ার আগেই নদী থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হয়ে ভবিষ্যতে নদীতে প্রজননক্ষম ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নোয়াখালীতে ইলিশ আহরণে বছরভেদে ওঠানামা রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছে ২২ হাজার ৬২১ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২২ হাজার ১৯১ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২২ হাজার ৭৫১ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৫৬৪ মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে।

চড়া দামের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের অনেকেই এখন ইলিশ কেনা থেকে বিরত থাকছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের পাতে ইলিশের পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছে অন্যান্য মাছ।

চেয়ারম্যানঘাটের মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, “আমরা চাই নদীতে আবার আগের মতো ইলিশ ফিরে আসুক। ইলিশ থাকলে জেলেরা বাঁচবে, ব্যবসায়ীরা বাঁচবে। পাশাপাশি ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে মাছ কিনতে পারবেন। এখন ইলিশের সংকটের কারণে হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ব্যবসায়ীরাও কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।”

এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ ইলিশ ধরলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন বাড়াতে নিষিদ্ধ জাল নির্মূল, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি এবং জেলেদের জন্য কার্যকর বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে ইলিশের সরবরাহ ও দাম—দুটিই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসএ