পদ্মায় বিনোদন, মুহূর্তেই মৃত্যুফাঁদ
ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী, লাইফ জ্যাকেট নেই; নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা
পদ্মা—রাজশাহীর মানুষের কাছে শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি নগরবাসীর আবেগ, বিনোদন আর জীবিকারও অংশ। বিকেল নামলেই টি-বাঁধ, শ্রীরামপুরসহ পদ্মাপাড়ে জমে মানুষের ভিড়। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন, কেউ ওঠেন ভ্রমণ নৌকায়, কেউবা নদীতে নামেন গোসল করতে। জেলেদের কাছে আবার এই নদীই জীবিকার প্রধান অবলম্বন। অথচ সেই চেনা পদ্মাই বর্ষায় হয়ে উঠছে ভয়ংকর। তীব্র স্রোত, ঘূর্ণাবর্ত, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ছোট নৌকা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের অভাব এবং মানুষের অসচেতনতায় বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা। আর প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নদীর পাড়ে শোনা যাচ্ছে স্বজন হারানোর আহাজারি।
সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই রাজশাহীতে নৌকাডুবির ঘটনায় বাবা-ছেলের মৃত্যুর ঘটনা আবারও পদ্মার ভয়াবহতা সামনে এনেছে। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর উদ্ধার হয় কাটাখালী থানার শ্যামপুর শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা ও নৌকার মাঝি কাওসার আলী (৬০) এবং তার তিন বছরের ছেলে জিয়ারুল হকের মরদেহ। কাওসারের মরদেহ কুষ্টিয়া থেকে এবং ছেলের মরদেহ পবা উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত ২৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেবীনগরে পদ্মায় ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু আরও একবার নদীটির ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা চালানো হলেও দুর্ঘটনা ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
পাঁচ বছরে রাজশাহীতে ৪০ নৌদুর্ঘটনা
রাজশাহী বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রাজশাহী জেলায় পদ্মায় ৪০টি নৌদুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে বহু মানুষের। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, একই সময়ে রাজশাহীর পদ্মায় খেয়া পারাপার, নৌকাডুবি কিংবা গোসল করতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে গোসল করতে নেমে মারা গেছেন ১৪ জন। নৌকাভ্রমণ বা খেয়া পারাপারের সময় নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে নয়জনের। বিভিন্ন সময়ে পদ্মা নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের অর্ধগলিত সাতটি মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি। কারণ নদীতে নিখোঁজ হওয়ার পর অনেকের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব মৃত্যুর সব তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না।
বাবা-ছেলের মৃত্যুর পরও প্রশ্ন নিরাপত্তায়
গত ৩০ জুলাইয়ের নৌকাডুবির ঘটনায় কাওসার আলী ও তার শিশু সন্তান জিয়ারুল হকের মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তে নিখোঁজ হওয়ার পর দুই দিন ধরে তাদের সন্ধান চালানো হয়। পরে দুই জায়গা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে পরিবারের অপেক্ষার অবসান হয়।
এর আগে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় ডিঙি নৌকা ডুবে তিনজন নিখোঁজ হন। দীর্ঘ সময় উদ্ধার অভিযান চালিয়েও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্বজনদের ভাষ্য, তিন দিক থেকে পানির স্রোত এসে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি করলে মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায় নৌকাটি।
নৌকাডুবিতে স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে হারানো জাহেরা বেগমের কান্না যেন পদ্মাপাড়ের অসংখ্য পরিবারের বেদনারই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, ‘নৌকাডুবিতে আমার স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। মুহূর্তেই আমার সংসার শূন্য হয়ে গেছে।’
বাবা ও দাদাকে হারিয়ে নির্বাক ছোট্ট তামিমও। তার কথায়, ‘পদ্মা নদীর পানিতে আমার দাদা আর বাবা হারিয়ে গেছে। দাদা-বাবা বাড়ি এলে আমাদের জন্য মজা নিয়ে আসত। এখন আর কেউ মজা নিয়ে আসবে না।’
বিনোদন কেন্দ্রেই বাড়ছে ঝুঁকি
রাজশাহী নগরীর পদ্মাপাড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষের ভিড়। বিশেষ করে শ্রীরামপুর, টি-বাঁধসহ বিভিন্ন এলাকায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। কেউ নদীর পাড়ে বসে সময় কাটান, কেউ পানিতে নামেন, আবার কেউ ওঠেন ভ্রমণ নৌকায়।
স্থানীয়দের দাবি, রাজশাহীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন স্থানে মানুষের বিনোদনের স্থান গড়ে উঠেছে। নগরীতে বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় পদ্মাপাড়ই অনেকের কাছে প্রধান বিনোদনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
তবে এই বিনোদনের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে বড় ঝুঁকি। স্থানীয়দের ভাষ্য, পদ্মায় বিপুলসংখ্যক ভ্রমণ নৌকা চলাচল করলেও এসব নৌযানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে যথেষ্ট নজরদারি নেই। অনেক নৌকায় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট থাকে না। কোথাও থাকলেও যাত্রীরা তা ব্যবহার করেন না।
ছোট নৌকাই বড় আতঙ্ক
পদ্মাপাড়ে ঘুরতে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুর রহমান বলেন, শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালালে হবে না; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমাতে হবে।
তার মতে, প্রতিটি নৌকায় নির্ধারিত সংখ্যার বেশি যাত্রী বহন বন্ধ করতে হবে। বাধ্যতামূলক করতে হবে লাইফ জ্যাকেট। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত মাঝি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড এবং নির্ধারিত স্থান ছাড়া নদীতে গোসল বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বলেন, বড় নৌকার তুলনায় ছোট নৌকাই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন এর অন্যতম কারণ। বর্ষায় পদ্মার স্রোত ও ঘূর্ণাবর্ত বেড়ে যাওয়ায় এ সময় ছোট নৌকা চলাচলে বিশেষ বিধিনিষেধ প্রয়োজন।
টি-বাঁধে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সামিম রহমান বলেন, অনেক নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হচ্ছে। অতিরিক্ত বোঝাই অবস্থায় ছোট নৌকা চলাচল করায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নৌযানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামও নেই।
জেলেদেরও প্রতিদিনের ঝুঁকি
পদ্মায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন শফিকুল ইসলাম। তার কাছে নদী যেমন জীবিকার উৎস, তেমনি প্রতিদিনের ঝুঁকিরও নাম।
তিনি বলেন, নদীর মাঝখানে মাছ ধরার সময় হঠাৎ ঝড়, ঢেউ কিংবা প্রবল বাতাস শুরু হলে ছোট নৌকা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন নৌকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জেলেদের নিরাপত্তার জন্য সরকারি উদ্যোগে লাইফ জ্যাকেট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে তারা আরও নিরাপদে মাছ ধরতে পারবেন।
অসচেতনতাই বড় কারণ
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাজশাহীসহ চার জেলায় গত পাঁচ বছরে ৬১টি নৌদুর্ঘটনার কল পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৭০ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে রাজশাহীতে দুর্ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অসাবধানতা ও অসচেতনতা। লাইফ জ্যাকেট থাকলেও অনেকে তা ব্যবহার করেন না। বিশাল পদ্মায় মাছ ধরা কিংবা চলাচলের কাজে ব্যবহৃত ছোট নৌকায় অনেক সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। গোসল করতে নেমেও মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাই নদীতে চলাচলকারী প্রত্যেককে নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।
রাজশাহী বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মঞ্জিল হক বলেন, নদী, পুকুরসহ যেকোনো জলাশয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে সচেতনতা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শেখানো প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে নৌ-পুলিশ
রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, পদ্মার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে মাঝি ও নৌভ্রমণকারীদের সচেতন করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাতার না জানা শিশুরা অনেক সময় নদীতে নামছে, অথচ পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি খেয়াল করছেন না। পরিবারের অসচেতনতার কারণেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব নৌকায় লাইফ জ্যাকেট নেই, সেসব নৌকার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। তবে এক-দুই দিনের অভিযান দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়; ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে।
সুপারিশের বাস্তবায়নই এখন বড় প্রশ্ন
পদ্মায় বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান, নেওয়া হয় নানা উদ্যোগের কথা। কিন্তু দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই অনেক ক্ষেত্রে আবারও আগের চিত্র ফিরে আসে। ফলে একই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, নৌযানে বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট, ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী পরিবহন, প্রশিক্ষিত মাঝি এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
পদ্মা তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেই স্রোত যেন আর কোনো পরিবারের স্বপ্ন কেড়ে না নেয়—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় দাবি। বিনোদনের নদী পদ্মা যেন বারবার মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত না হয়, তার জন্য দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এসএ




Comments