কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন ‘পায়রা ভবন’ সরকারি বিধি অনুসরণ না করেই ভেঙে ফেলা এবং ভবনের মালামাল বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তারের বিরুদ্ধে।
উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত ‘পায়রা ভবন’টি ১৯৯০-এর দশকে নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে ভবনটির একাধিকবার সংস্কার করা হয়। সর্বশেষ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সুমন ভবনটিতে বসবাস করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন ভবনটিতে ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র নষ্ট হলেও মূল অবকাঠামো অক্ষত ছিল।
সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হলে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনে কনডেমনেশন কমিটি গঠন, সরেজমিন পরিদর্শন, প্রতিবেদন, দরপত্র আহ্বান, নিলাম বিজ্ঞপ্তি এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার পরই ভবন অপসারণের অনুমতি দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন ইউএনও নাঈমা ইসলাম ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। পরে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কনডেমনেশন কমিটি গঠন করা হলেও পরবর্তী কার্যক্রম আর এগোয়নি।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, নাছরীন আক্তার ইউএনও হিসেবে যোগদানের পর দরপত্র, নিলাম বিজ্ঞপ্তি কিংবা সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা ছাড়াই ভবনটি ভেঙে ফেলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনের দরজা, জানালা, ইট, রডসহ বিভিন্ন মালামাল বিক্রি করা হলেও সরকারের রাজস্ব আদায় হয়নি।
উপজেলা প্রকৌশল অফিসের প্রাক্কলনে ভবনের মালামালের মূল্য ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫০৪ টাকা এবং ভাঙার ব্যয় ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে সর্বনিম্ন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে ভেঙে ফেলা ভবনটি পরিদর্শন করা হয়। পরে কনডেমনেশন কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, প্রায় ছয় থেকে সাত মাস আগে কয়েক দিন ধরে ভবনটি ভাঙা হয় এবং রাতের বেলায় ট্রাকে করে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়।
দাউদকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটির প্রাক্কলন ব্যয় প্রস্তুত করে জমা দেওয়া হয়েছিল। এরপর কী হয়েছে, তা তার জানা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও নাছরীন আক্তারের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
তৎকালীন ইউএনও নাঈমা ইসলাম বলেন, তিনি শুধু ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার আবেদন করেছিলেন। তার বদলির আগে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার উপপরিচালক মেহেদী মাহমুদ আকন্দ বলেন, অভিযোগটি সত্য হলে তা গুরুতর অনিয়ম। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি তার নজরে আসার পর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার জানান, অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলামকে দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনের ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




Comments