ধারণক্ষমতার বেশি আলু, হিমাগারে পচছে মজুত
বাড়তি মজুতে ব্যাহত সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, লোডশেডিংয়ে বাড়ছে জেনারেটর ব্যয়; কৃষক-ব্যবসায়ীদের ক্ষতির শঙ্কা
আলুর বাম্পার ফলনে মৌসুমের শুরুতেই হিমাগারে জায়গার জন্য তৈরি হয়েছিল তীব্র চাপ। সেই চাপ সামাল দিতে গিয়ে কোথাও কোথাও ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে হিমাগারে আলুর স্বাভাবিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পচন ধরেছে মজুত আলুতে। কোথাও প্রতিদিন গাড়ি ভর্তি করে পচা আলু হিমাগার থেকে বের করে ফেলে দিতে হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজশাহীর তানোর, পবা ও নওহাটা এলাকার কয়েকটি হিমাগার ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় শুরু থেকেই হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণের চাপ ছিল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু হিমাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু নেওয়া হয়েছে। এতে আলুর অবস্থান পরিবর্তন, পর্যাপ্ত বাতাস দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লোডশেডিং।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় ৪০টি হিমাগারের মধ্যে ৩৮টি সচল রয়েছে। এসব হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে উৎপাদন বেশি হওয়ায় বেশ কিছু হিমাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
হিমাগার থেকে বের হচ্ছে পচা আলু
তানোর উপজেলার তালন্দ এলাকার তামান্না স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে দেখা যায়, গাড়ি ভর্তি করে পচে যাওয়া আলু হিমাগার থেকে বের করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ওই হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন ব্যবসায়ী হামিম হোসেন।
তিনি বলেন, “ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু লোড নেওয়া হয়েছিল। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে আলু ঘেমে পচে যাচ্ছে। পচে যাওয়া আলু ফেলে দিতে হচ্ছে।”
তবে আলু পচনের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে দায়ী করছেন না রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী। তাঁর দাবি, মূল সমস্যা হিমাগার ব্যবস্থাপনায়।
আহাদ আলী বলেন, “লোডশেডিংয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। হিমাগার মালিকদের অব্যবস্থাপনার কারণেই আলু পচে যাচ্ছে। তাঁরা মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত আলু লোড নিয়েছেন।”
হিমাগারের ভাড়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর দাবি, হিমাগার মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে সংরক্ষণ খরচ বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি আলু ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৪ টাকা দরে সংরক্ষণ করা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৬ টাকা ৭৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, “ওভারলোডিংয়ের কারণেই মূলত আলু পচে যাচ্ছে। একটি হিমাগারে বছরে ২৫ থেকে ৩০ বার আলুর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। আলু বের করে বাতাস দেওয়াও প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত লোডের কারণে অনেক হিমাগার এবার সেই কাজ করছে না।”
তিনি জানান, নওহাটার একটি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন হলেও সেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রাজশাহীর প্রায় সব হিমাগারেই কমবেশি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু নেওয়া হয়েছে।
সংরক্ষণ ভাড়া কমানোর দাবি
আলু সংরক্ষণের বাড়তি খরচ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে সোমবার (২৪ আগস্ট) পবা উপজেলার তকিপুরে জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ব্যবসায়ীরা। সেখানে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া প্রতি কেজি ৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একদিকে সংরক্ষণ খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে হিমাগারে আলু নষ্ট হচ্ছে। ফলে দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন তাঁরা। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে বেশি দামে আলু কিনে হিমাগারে রাখা ব্যবসায়ীদের লোকসানের ঝুঁকি বেশি।
অতিরিক্ত মজুতের অভিযোগ অস্বীকার
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান। তাঁর দাবি, মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু হিমাগারে ধারণক্ষমতার বেশি আলু নেওয়া হলেও বর্তমানে ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো সমস্যা নেই। অতিরিক্ত মজুদের কারণে আলু নষ্ট হচ্ছে—এমন অভিযোগও তিনি মানতে নারাজ।
তবে লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগার মালিকদের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।
ফজলুর রহমান বলেন, “বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত হিমাগার ঠাণ্ডা থাকে। এর বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। এক ঘণ্টা জেনারেটর চালালেই বাড়তি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। বর্তমানে প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এমনিতেই বিদ্যুৎ বিল বেশি। একটি হিমাগারকে মাসে ২৫ থেকে ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল দিতে হয়। এর সঙ্গে জেনারেটরের খরচ যোগ হলে আমাদের আরও সমস্যা হয়। আমরা চাই, হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক।”
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
হিমাগার মালিকদের লোডশেডিংয়ের অভিযোগের বিষয়ে রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, “গত বুধবার থেকে লোডশেডিং কমে গেছে। এখন পরিস্থিতি ভালো। হিমাগারে সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে কেউ আমাকে ফোনও করেননি। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও তাঁদের সমস্যা হয় না।”
এতে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি নিয়ে হিমাগার মালিক ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। হিমাগার মালিকেরা বাড়তি জেনারেটর ব্যয়ের কথা বললেও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
নজরদারিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, “বিভাগের হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কোথাও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ বা সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহীতে এবার আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় হিমাগারে সংরক্ষণের চাপও বেড়েছে। এ অবস্থায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু মজুত করা হলে এবং পর্যাপ্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে মৌসুমের শেষ দিকে পচনের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা।
তাই হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রকৃত অবস্থা যাচাই, ধারণক্ষমতা অনুযায়ী মজুত নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসএ




Comments