গাইবান্ধার প্রায় ২৪ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যার জেনারেল (সদর) হাসপাতাল। কাগজে-কলমে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হলেও বাস্তবে তীব্র চিকিৎসক সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও প্রশাসনিক নানা অনিয়মের অভিযোগে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ফলে এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সুস্থতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়তে হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। অন্তর্বিভাগেও শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা থাকে বেশি। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হওয়ায় অর্ধেকেরও বেশি রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে বিভিন্ন ওয়ার্ডে সৃষ্টি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। শৌচাগারগুলো থেকেও ছড়াচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ। এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।
মেঝেতে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাসপাতাল মনে হয় না, যেন ময়লার ভাগাড়। এখানে সুস্থ মানুষ এলেও অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পুরোনো ১০০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসকের অনুমোদিত ৪২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে ২০ জনের।
এদিকে, ২০১৮ সালে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া হাসপাতালের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে জরাজীর্ণ পুরোনো ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
চিকিৎসাসেবার সংকটের পাশাপাশি হাসপাতাল প্রশাসনের কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। একটি বিশেষ ঠিকাদারি চক্রকে কাজ পাইয়ে দিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে দরপত্রে অস্বাভাবিক কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র আহ্বানের নোটিশ প্রকাশের আগেই নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা থাকার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের পক্ষে দরপত্রে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া মাত্র ১৬ দিনের নোটিশে তিন বছরের অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার শর্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, গত অর্থবছরেও মন্ত্রণালয় থেকে সতর্ক করা হলেও একই ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে কাজ দেওয়া হয়েছে। প্রভাবশালী ওই চক্রের কারণে সাধারণ ঠিকাদারেরা দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তাদের দাবি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত হাসপাতালের শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ, নতুন ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে।
এসএ




Comments