এক শিক্ষক, তিন বিষয়ের ক্লাস—সংকটে ভোলার ঐতিহ্যবাহী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়
বাড়ছে প্রাইভেট-কোচিং নির্ভরতা
ভোলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনায় বিদ্যালয়টির স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ৫৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ২১টি পদ। ফলে বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষককে দিনে ছয়-সাতটি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান, ব্যবহারিক শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকদের একাডেমিক তদারকি—সবকিছুতেই তৈরি হচ্ছে চাপ।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের এ সংকটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মান ও পরিবেশে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের ব্যবহারিক ক্লাস, আইসিটি শিক্ষা এবং বিষয়ভিত্তিক পাঠদানে রয়েছে ঘাটতি। এর সুযোগে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মনির বাংলা বিষয়ের শিক্ষক। গত রোববার তাঁকে একই দিনে একাধিক শ্রেণিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়েছে। ওই দিন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ইংরেজি, সপ্তম শ্রেণিতে বাংলা, অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা দ্বিতীয় পত্র, নবম শ্রেণির দুটি শাখায় বাংলা ও বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং দশম শ্রেণিতে ইতিহাস পড়িয়েছেন তিনি।
শুধু আবদুল্লাহ আল মনির নন, শিক্ষকসংকটের কারণে অন্যান্য শিক্ষককেও নিয়মিতভাবে নিজ বিষয়ের বাইরে ক্লাস নিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এতে শিক্ষকরা একদিকে অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রভাতি ও দিবা শাখা মিলিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫৩টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ ২১টি পদ শূন্য।
বিষয়ভিত্তিক হিসাবেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। বাংলা বিভাগের আটটি পদের মধ্যে দুটি, ইংরেজির আটটির মধ্যে দুটি, গণিতের ছয়টির মধ্যে দুটি, ভৌতবিজ্ঞানের চারটির মধ্যে একটি, জীববিজ্ঞানের চারটির মধ্যে তিনটি, ব্যবসায় শিক্ষার চারটির মধ্যে একটি এবং ভূগোলের দুটি পদের মধ্যে একটি শূন্য।
এ ছাড়া শারীরিক শিক্ষা, চারুকলা ও টেকনিক্যাল বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক পদও সৃষ্টি হয়নি। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের পদ নেই। অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগারে ঝুলছে জংপড়া তালা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, ল্যাবটি বছরের পর বছর নিয়মিত ব্যবহৃত হয় না।
ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ টি এম খলিলুর রহমান বলেন “বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকসংকট ও পাঠদানের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। পাঠদান পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের পরিস্থিতি জানতে অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ১১১ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে লিখিত মতামত নেওয়া হয়। এর মধ্যে অষ্টম শ্রেণির ২৭ জন, নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ২৮ জন এবং দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ৪৩ জনসহ মোট ৯৮ জনের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতামতে উঠে এসেছে, বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়েছে এবং অনেক সময় এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়। তাদের দাবি, নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান না হওয়ায় প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ছে।
বিশেষ করে দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ৪৩ শিক্ষার্থীর সবাই কোচিং বা প্রাইভেট পড়ছে বলে মতামত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কেউ কেউ আটটি বিষয় পর্যন্ত প্রাইভেট পড়ছে।
প্রাইভেট পড়ার কারণ জানতে চাইলে ২৬ জন শিক্ষার্থী জানিয়েছে, বিদ্যালয়ে ঠিকমতো পড়ানো হয় না। আর ১২ জন জানিয়েছে, পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য তারা প্রাইভেট পড়ে।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অভিযোগ করেছে, কিছু শিক্ষক নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করতে পারেন না, নিয়মিত বাড়ির কাজ দেন না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্লাসে পাঠদানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে একই সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছে, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে ভালোভাবে পাঠদান করেন। অর্থাৎ সংকটটি শুধু শিক্ষকসংখ্যার নয়; বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা, নিয়মিত ক্লাস, একাডেমিক তদারকি, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং জবাবদিহি—সবগুলো বিষয়ের সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি।
গণিতের শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান জানান, গণিতের ছয়টি পদের বিপরীতে বর্তমানে চারজন শিক্ষক রয়েছেন। অন্যান্য বিষয়েও প্রায় একই ধরনের সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে একজন শিক্ষককে প্রতিদিন ছয় থেকে সাতটি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হয়। রুটিন ঠিক রাখতে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাসও নিতে হয়। আলাদা ল্যাবরুম ও ল্যাব সহকারী না থাকায় ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনায়ও সমস্যা হয়। আইসিটি শিক্ষক ও লাইব্রেরিয়ান না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কমপক্ষে ১২ জন অভিভাবক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা কমতে পারে। তাদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকসংকট দূর করার পাশাপাশি নিয়মিত একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।
ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ টি এম খলিলুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকসংকট ও পাঠদানের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। শিক্ষকস্বল্পতার কারণে পাঠদান পরিচালনা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সালাউদ্দীন আহমেদ জানান, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সংকটের প্রধান সমাধান সরকারি নিয়োগ।
ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়সহ জেলার অন্যান্য সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শামিম রহমান।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে দ্রুত শূন্য পদে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, আইসিটি ও ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা, বিজ্ঞানাগার সচল করা, পাঠাগার কার্যক্রম কার্যকর করা এবং নিয়মিত একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করা দরকার।
একই সঙ্গে শিক্ষককে নিজ বিষয়ের বাইরে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দিয়ে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। এতে শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর চাপ কমবে না, বরং প্রাইভেট-কোচিং নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
এসএ




Comments