ঢাকার ধামরাই উপজেলা পরিষদ চত্বরসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি একসময় ছিল নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিল্পীদের পদচারণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর থাকত একাডেমি প্রাঙ্গণ। তবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমানে আধুনিক ভবন থাকলেও নেই প্রাণের স্পন্দন। প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ধামরাই শিল্পকলা একাডেমির নিয়মিত কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, একাডেমির আধুনিক ভবনটি বাইরে থেকে ভালো মনে হলেও ভেতরের চিত্র ভিন্ন। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনা জমেছে। কোথাও কাচের টুকরা, টেবিল-চেয়ার পড়ে রয়েছে। ভবনের দরজায় ঝুলছে তালা। জানালার কিছু অংশও ভাঙা। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভবনটির সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ধীরে ধীরে নাজুক হয়ে পড়ছে অবকাঠামো।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর তৎকালীন সংসদ সদস্য এম এ মালেকের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। এ উপলক্ষে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে চলে নাচ, গান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর একবার কার্যক্রম চালু হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক যুগ। নিয়মিত কার্যক্রম আর চালু হয়নি।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, একসময় এই একাডেমিতে নিয়মিত রেওয়াজ হতো। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী সংস্কৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর থাকত ভবনটি। বর্তমানে সেখানে নেই কোনো সাংস্কৃতিক চর্চা। জনবল সংকটের পাশাপাশি ভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে।
প্রবীণ সাংবাদিক দীপক চন্দ্র পাল বলেন, “একসময় শিল্পকলা একাডেমির ভবন সরগরম থাকত। আমরা শিক্ষার্থীদের গান শেখাতাম। প্রতিদিন রেওয়াজ হতো। সকাল-বিকেল শিক্ষার্থীদের আনাগোনা ছিল। স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীরাও ভিড় জমাতেন। আজ শুধু শিল্পকলা একাডেমির ভবন আছে, কিন্তু সেই সুরের মূর্ছনা নেই, নেই প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রায় ১৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ।”
স্থানীয় বাসিন্দা এম. নাহিদ মিয়া বলেন, “সংস্কৃতি একটি সমাজ বা জাতির জীবনযাপনের সামগ্রিক রূপ। এর মধ্যে গান, নাচ, নাটক, চিত্রশিল্পসহ নানা বিষয় রয়েছে। ধামরাই শিল্পকলা একাডেমি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়নি, নতুন প্রজন্মের মেধা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালু করা হোক।”
ধামরাইয়ের জিরো ব্র্যান্ডের কর্ণধার ও সংগীতশিল্পী মাহফুজুর রহমান মাহফুজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকলা একাডেমি বন্ধ থাকায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। উপযুক্ত চর্চাকেন্দ্রের অভাবে ধামরাইয়ের উঠতি শিল্পীরা তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নাচ, গান, নাটক ও চিত্রাঙ্কনের মতো সৃষ্টিশীল ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ না থাকলে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। কার্যক্রম চালু হলে এখান থেকেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী উঠে আসতে পারেন।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র সাংবাদিক মো. মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যবাহী ধামরাই শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এখানকার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনার ক্ষেত্রে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের যুক্ত করা প্রয়োজন। যথাযথ প্রশিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট জনবল নিয়োগের মাধ্যমে নতুন উদ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু করা হলে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
ধামরাই শিল্পকলা একাডেমির সাবেক আবৃত্তি শিক্ষক আবু তৈয়ব খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা থেকে নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ছে। একসময় ভবনটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরগরম ছিল। এখন সেখানে নীরবতা। শিশু-কিশোরদের সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে যুক্ত রাখতে দ্রুত শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুন বলেন, জনবল সংকটের কারণে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একাডেমির প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নতুন করে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে কার্যক্রম চালু করার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ধামরাইবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্রুত শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে। পাশাপাশি সংস্কার ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটি আবারও ধামরাইয়ের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।
এসএ




Comments