Image description

একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি নির্ভর করে সেই সমাজে নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদ এবং তাদের বিকাশের সুযোগ কতটা উন্মুক্ত। প্রতিটি শিশুর জন্য সুরক্ষিত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ আজকের এই সুরক্ষিত শিশুরাই গড়ে তুলবে আগামীর সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজশাহী মহানগরীর নানকিং দরবার হলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ আয়োজিত ‘রাজশাহী শহর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এডিপি)’ অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।

শিশু ও নারীর নিরাপত্তা উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি 

জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে শিশু অধিকার সুরক্ষায় বাস্তব চিত্রের ওপর আলোকপাত করে বলেন, “আমাদের শিশুরা এই সমাজে সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠুক, নির্বিঘ্নে শিক্ষার সুযোগ পাক—এটাই মূল লক্ষ্য। একটি দেশের অগ্রগতির প্রধান মাপকাঠি হলো সেখানে নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। প্রতিটি শিশুকে শিক্ষা, পুষ্টি ও মৌলিক সুরক্ষার আওতায় আনতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, সরকারের পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এগিয়ে এলে শিক্ষা বিস্তার, শিশুদের ঝরে পড়া রোধ এবং মাদক প্রতিরোধের মতো জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা অনেক বেশি সহজ ও গতিশীল হবে। এ জন্য পরিবার ও সমাজের যৌথ সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

ঝুঁকিপূর্ণ ২৯ হাজার পরিবারসহ ৫ লাখ মানুষ আসবে সেবার আওতায় 

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, রাজশাহী শহর এডিপির লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৫ সাল থেকেই বহুমুখী মূল্যায়ন ও প্রস্তুতিমূলক কাজ পরিচালিত হচ্ছে। অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়, শিশু উপদেষ্টা কমিটি গঠন, তথ্য সংগ্রহ এবং শিশু ও যুব ফোরাম গঠনের মাধ্যমে কর্মসূচিটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার মোট ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫০টি পরিবারের প্রায় ৫ লাখ ৫ হাজার ৩২৪ জন মানুষ এই কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল পাবেন। এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৯ হাজার ৯১৮টি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাজশাহী শহর এডিপির সিনিয়র ম্যানেজার লোটাস চিসিম। তিনি জানান, কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিশুদের সার্বিক কল্যাণ। স্থানীয় জনগণ, সিটি করপোরেশন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ওয়াশ (পানি-স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি), মানসম্মত শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া পিছিয়ে পড়া শিশুদের পড়ার দক্ষতা অর্জনে পরিচালিত হবে বিশেষ ‘আনলক লিটারেসি’ এবং লার্নিং রুটস সেন্টার কার্যক্রম। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে থাকবে কঠোর নজরদারি।

কার্যক্রম চলবে ২০৩৭ সাল পর্যন্ত 

সভায় সভাপতির বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সিনিয়র ডিরেক্টর (অপারেশনস) চন্দন জেড. গমেজ বলেন, “আমরা স্থানীয় মানুষের মতামত ও পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে এই কাজ শুরু করেছি। আমাদের কাজের মূল শক্তি স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক জবাবদিহিতা। মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।”

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্থায়ী সক্ষমতা বাড়াতে ‘আল্ট্রাপুওর গ্র্যাজুয়েশন মডেল’, কমিউনিটি গ্রিনিং এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প জীবিকায়নের ওপর জোর দেওয়া হবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এ মূল প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পরবর্তী দুই বছরের ট্রানজিশন পরিকল্পনাসহ পুরো কার্যক্রম শেষ হবে ২০৩৭ সালে।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর ড. জ্যারেড বেরেন্ডস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন রাজশাহীর বিভাগীয় পরিচালক এ কে এম মুজাহিদুল ইসলাম, রাজশাহী ক্যাথলিক ধর্মপ্রদেশের ডিডি রেভারেন্ড বিশপ জের্ভাস রোজারিও এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন নর্দান বাংলাদেশ ক্লাস্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর (ফিল্ড অপারেশনস) রাজু উইলিয়াম রোজারিওসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, এনজিও কর্মকর্তা ও শিশু ফোরামের প্রতিনিধিরা।

এসএ