Image description

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের ছয় গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সাত বছরেও পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় বর্তমানে বাঁশের সাঁকো ও নৌকাই তাদের চলাচলের প্রধান ভরসা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার আবেদন-নিবেদন করেও এখনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে কুড়িকাহুনিয়া-গড়াইমহল খাল হয়ে কপোতাক্ষ নদের ওয়াপদার পুরোনো লঞ্চঘাট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ছিল। এ পথ দিয়ে কুড়িকাহুনিয়া ও শ্রীপুর গ্রামের ১০ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করতেন। অন্যদিকে, মকবুল গাজীর বাড়ির সামনে কালভার্ট পার হয়ে সনাতনকাটি-নাকনা সংযোগ সড়কটিও প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ। এ পথ দিয়ে সনাতনকাটি, নাকনা, গোকুলনগর ও গোয়ালবাটি গ্রামের প্রায় ১৮ হাজার মানুষ চলাচল করতেন।

এ দুটি সড়ক দিয়ে স্থানীয় ছয় গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষের পাশাপাশি প্রতাপনগর ও আনুলিয়া ইউনিয়ন এবং খুলনার কয়রা উপজেলারও বহু মানুষ যাতায়াত করেন। দশআনিয়া খেয়াঘাট পার হয়ে এ পথ দিয়ে যাতায়াত করলে বিভিন্ন কাজে সহজে যাওয়া যায়। পুরোনো লঞ্চঘাটে পৌঁছেও খুলনায় যাওয়ার তুলনামূলক সহজ পথ এটি।

স্থানীয়রা জানান, ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে ওই এলাকার ঘরবাড়ি, পুকুর, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরের বছর ২০২১ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জোয়ারের পানিতে ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। নদীর পানির প্রবল স্রোতে দুটি সড়কই বিভিন্ন স্থানে সম্পূর্ণ ভেসে যায়। কোথাও কোথাও ২০ হাতের বেশি গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়।

পরবর্তীতে বাঁধ সংস্কার করে মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। ফলে চলাচলের চরম দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয় উদ্যোগে গড়াইমহল খালের ওপর ইউনিয়ন পরিষদের সামনের সড়কের মুখ থেকে প্রায় ৭০০ ফুট দীর্ঘ একটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, সাত-আটটি করে বাঁশ পাশাপাশি বিছিয়ে পেরেক দিয়ে তৈরি করা সাঁকোটি দিয়ে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একই সময়ে দুই দিক থেকে মানুষ এলে একে অপরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ভারী মালামাল বহন করাও প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে সনাতনকাটি, নাকনা, গোকুলনগর ও গোয়ালবাটি গ্রামের মানুষকে অনেক ক্ষেত্রে নৌকায় পারাপার হতে হয়।

এই দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একজন শিক্ষার্থীরা। প্রতাপনগর ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কুড়িকাহুনিয়া মহিলা মাদ্রাসা, প্রতাপনগর ফাজিল মাদ্রাসা, প্রতাপনগর আল আমিন মহিলা মাদ্রাসা, কুড়িকাহুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্থানীয় হাফিজিয়া মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থী প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো ও নৌপথ ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে।

বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। অনেক শিক্ষার্থী পানিতে পড়ে ভিজে যায়। কখনো বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়, আবার অনেকেই দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁশ ভেঙে সাঁকো থেকে পড়ে প্রায়ই কেউ না কেউ দুর্ঘটনার শিকার হন।

ইউনাইটেড একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়দেব কুমার দাশ বলেন, শ্রীरामকাটি, শ্রীপুর, নাংলা ও গোকুলনগরসহ আশপাশের গ্রামের শিক্ষার্থীরা এই পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ লস্করী-খাজরা হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে বিদ্যালয়ে আসে। বর্ষায় সাঁকো ও নৌপথে ভিজে বই-খাতা ও পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতেও পারে না।

নাকনা গ্রামের শিক্ষার্থী নাইম হাসান ও তাজমিরা আক্তার জানায়, তাদের প্রতিদিন যাতায়াতে অনেক কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। বর্ষাকালে অনেক সময় স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী রিয়াছাত আলী বলেন, এলাকার অনেক ঘরবাড়ি ও জমি খালের ভাঙনে চলে গেছে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ার পর হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রায় ১১ থেকে ১২শ বাঁশ দিয়ে সাঁকোটি নির্মাণ করা হয়েছে। সাঁকো ও নৌপথে চলাচল করতে গিয়ে অনেকে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। জনস্বার্থে দ্রুত সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রতাপনগরের উপাধ্যক্ষ মাওলানা অহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতাপনগর একটি ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিয়ন। এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থা স্থায়ীভাবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসেনি। বাধ্য হয়ে স্থানীয়দের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো ও নৌপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ইউপি চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালী বলেন, ২০২০-২১ সালে ওয়াপদা বাঁধ ভেঙে ইউনিয়নটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সনাতনকাটি ও কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় ভাঙনে কোথাও কোথাও প্রায় ৩০ ফুট গভীরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সাঁকো ও নৌপথের পাশাপাশি মানুষকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ঘুরে তালতলা হয়ে দৈনন্দিন কাজ, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। সাঁকো ভেঙে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। দ্রুত সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন।

এ বিষয়ে আশাশুনি উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী অনিন্দ্যদেব সরকার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইনব্যাংক (প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র/অনুমোদন) পাওয়া গেলে অথবা এলজিইডি এনওসি পেলে সড়কের কাজ শুরু করা যাবে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের এই যোগাযোগ সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত সড়ক ও প্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

এসএ