জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিসাব বদলাতে শুরু করেছে রাজশাহীর সাধারণ মানুষের। মোটরসাইকেল কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে আগের মতোই তেল মিললেও প্রতি লিটারে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ফলে পাম্পে তেল নিতে এসে অনেকের মুখে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। কেউ আগের তুলনায় কম পরিমাণে তেল নিচ্ছেন, আবার কেউ বাড়তি খরচের হিসাব কষছেন যাতায়াত ও সংসারের ব্যয়ের সঙ্গে। তবে দাম বাড়লেও নগরীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে এখনো তেল সরবরাহ ও বিক্রি স্বাভাবিক রয়েছে; কোথাও দীর্ঘ লাইন বা জ্বালানি সংকটের চিত্র দেখা যায়নি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে নিয়মিতভাবেই পাম্পে আসছেন ক্রেতারা। তবে আগের তুলনায় অনেকেই কম পরিমাণে জ্বালানি কিনছেন বলে জানিয়েছেন পাম্পসংশ্লিষ্টরা।
পাম্পে স্বাভাবিক সরবরাহ, ক্রেতার মুখে অসন্তোষ
সরেজমিনে নগরীর গোলগোপুর পেট্রোলিয়াম পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, স্বাভাবিক নিয়মেই পেট্রোল, অকটেনসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে। পাম্পে ক্রেতাদের উপস্থিতিও ছিল স্বাভাবিক। যানবাহন নিয়ে আসা ক্রেতারা নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি কিনে গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন।
তবে তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ স্পষ্ট। ক্রেতাদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম শুধু যানবাহনের খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ব্যয় বাড়লে ধাপে ধাপে এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্য পরিবহন, বাজারদর ও বিভিন্ন সেবার খরচেও। ফলে শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরই পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।
আয় একই, ব্যয় বাড়ছে
গোলগোপুর পেট্রোলিয়াম পাম্পে তেল নিতে আসা মেহেদী হাসান বলেন, ‘‘তেলের দাম বাড়ায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য যারা যানবাহন ব্যবহার করেন, তাদের খরচ আরও বেড়ে যাবে। আয় একই থাকলেও ব্যয় বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।’’
পবা উপজেলার খড়খড়ি এলাকার আরেক ক্রেতা ওমর ফারুক বলেন, ‘‘তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির মালিক বা চালকদের খরচ বাড়ে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার খরচও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।’’
কমেছে কেনার পরিমাণ
পাম্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির পরও তেল সরবরাহে কোনো সংকট তৈরি হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রেতারা নিয়মিত তেল কিনছেন। তবে আগের তুলনায় অনেক ক্রেতা কম পরিমাণে জ্বালানি নিচ্ছেন।
গোলগোপুর পেট্রোলিয়াম পাম্পের কর্মচারী আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ‘‘তেলের দাম বাড়লেও বিক্রি স্বাভাবিক রয়েছে। প্রতিদিনের মতোই মানুষ তেল কিনতে আসছেন। তবে দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে।’’
তিনি জানান, পাম্পে তেল সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই; ক্রেতারা প্রয়োজন অনুযায়ী তেল কিনছেন।
পাঁচ লিটারের জায়গায় তিন লিটার
নগরীর রুয়েটের সামনে নয়ান পেট্রোলিয়াম পাম্প এজেন্সির কর্মচারী সাফওয়ান বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই তাঁদের পাম্পে তেল বিক্রি হচ্ছে। তবে দাম বাড়ার কারণে ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘‘বেচাকেনা কিছুটা কমেছে। আগে যারা পাঁচ লিটার তেল নিতেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন তিন লিটার নিচ্ছেন।’’
সাফওয়ান আরও বলেন, এখন পর্যন্ত তেল বিক্রি বা সরবরাহে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই তেল বিক্রি হচ্ছে এবং পাম্পে তেলের কোনো সংকট নেই।
সংকট নেই, নেই দীর্ঘ লাইনও
পাম্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম বাড়লেও নগরীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকট কিংবা দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রেতারা তেল কিনছেন।
তবে দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক ক্রেতাই আগের তুলনায় কম পরিমাণে জ্বালানি নেওয়ায় বিক্রির পরিমাণে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারকারীদের মধ্যে খরচ কমাতে কম পরিমাণে তেল নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাম্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন দামে বাজার পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক থাকলেও ক্রেতাদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো প্রয়োজনের সঙ্গে কিছুটা হিসাব মিলিয়ে জ্বালানি কিনছেন তাঁরা।
বাড়তি খরচের প্রভাব নিয়ে শঙ্কা
এদিকে ক্রেতাদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাজারের অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
ফলে পাম্পগুলোতে আপাতত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও তেলের দাম বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে চিন্তিত সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রশ্ন—জ্বালানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে যদি পরিবহন ও পণ্যের দামও বাড়তে থাকে, তাহলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর সেই বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার পথ কী হবে?
ডিআর




Comments