Image description

রাজশাহীর পদ্মা সরকারি কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই পাল্টাপাল্টি হুমকিতে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহীর ছাত্ররাজনীতি। সংঘর্ষে দুই সংগঠনের পাঁচ নেতা-কর্মী আহত হওয়ার পর মহানগর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতারা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজ নেওয়ায় সমঝোতার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দেওয়া বক্তব্য এবং রাতে ছাত্রদলের পাল্টা বক্তব্যে সেই পরিস্থিতি ফের উত্তেজনার দিকে গড়িয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে পদ্মা সরকারি কলেজে ভর্তি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবিরের স্থাপিত হেল্প ডেস্কের ব্যানার টাঙানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে ছাত্রশিবিরের তিনজন এবং ছাত্রদলের দুজন আহত হন। আহতদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে মহানগর ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতারা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের দেখতে যান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুই সংগঠনের মধ্যে অস্থিরতা এড়াতে নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগও দেখা যায়। এতে রাজশাহীর রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি।

সংঘর্ষের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাহেববাজার থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে সোনাদিঘীর মোড় এলাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য ইমরান নাজির ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় হুমকি দেন।

তিনি বলেন, আমরা ছাত্রদলের বন্ধুদের বলছি, আমরা ধৈর্যের সীমার একেবারে শেষ পর্যায়ে আছি। যদি আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, প্রত্যেকটা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীকে কুত্তার মতো পিটিয়ে রাজশাহী ছাড়া করব। তাঁর এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।

ইমরান নাজির আরও বলেন, তাঁর কোনো নেতা-কর্মী আহত হলে ছাত্রদলের কোনো ‘টোকাই মার্কা’ নেতার ‘পিঠের চামড়া’ রাখা হবে না। ছাত্রশিবির কোনো ‘ভেসে আসা সংগঠন’ নয় দাবি করে তিনি বলেন, সংগঠনটি রাজপথে জীবন দেওয়া সংগঠন। কোনো নেতা-কর্মীর ওপর হামলা হলে তার ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এ কে এম সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেলে এই রাজশাহীর ময়দান থেকে ওই ছাত্রদল-যুবদলকে বিতাড়িত করতে আমাদের এক ঘণ্টা সময় লাগবে না”। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় এইচআরডি সম্পাদক আবদুর রহিম, মহানগর শাখার সাবেক সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ ও খায়রুল ইসলাম বক্তব্য দেন।

রাজশাহীতে ছাত্রদল-শিবিরের উত্তেজনার বিষয়ে জানতে চাইলে এ কে এম সারওয়ার জাহান বলেন, একটি গোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পদ্মা সরকারি কলেজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা সংঘাত না বাড়িয়ে রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করা উচিত। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা চাই, রাজশাহীতে সুস্থ ও সহনশীল রাজনৈতিক চর্চা বজায় থাকুক এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত হোক। পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে যেকোনো বিরোধের সমাধান করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ছাত্রশিবিরের এই বক্তব্যের পর রাতেই পাল্টা হুঁশিয়ারি দেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব এমদাদুল হক (লিমন)। শহীদ মিনার এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ‘কুকুরের মতো পিটিয়ে’ রাজশাহী থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলা ছাত্রশিবির সভাপতির মুখে শোভা পায় না।

ইমদাদুল হক বলেন, ইমরান নাজির সাহেব আপনার বাসা কুমিল্লা। আপনি হয়েছেন পিআর পদ্ধতিতে নেতা। রাজশাহীতে আমাদের নাড়ি পোঁতা, এই রাজশাহীতেই আমাদের জন্ম, পৈতৃক ভিটার ওপর বসবাস করি। ছাত্রদল রাজপথে নামলে ছাত্রশিবির রাজশাহীতে পা রাখার জায়গা পাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

পদ্মা সরকারি কলেজের ঘটনার বিষয়ে ছাত্রদলের এই নেতা অভিযোগ করেন, ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বহিরাগতরা যোগ দিয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে হামলার ‘অল্প পরিমাণ প্রতিরোধ’ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে রাতে এক ভিডিও বার্তায় রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম রবি ছাত্রশিবিরের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, শান্তির শহর রাজশাহীতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা চান না তাঁরা। ছাত্রদল, বিএনপি কিংবা সাধারণ মানুষ—কারও গায়ে হাত দেওয়া বা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের চেষ্টা করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ছাত্রশিবির নেতা ইমরান নাজিরকে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘মার্জিত’ ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে রফিকুল ইসলাম রবি বলেন, পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা হলে রাজপথেই এর ফয়সালা হবে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মো. গাজিউর রহমান বলেন, সকালে পদ্মা সরকারি কলেজে একটি ঘটনা ঘটেছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ টহল বাড়ানো হয়েছে।

রাজশাহীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে দুই সংগঠনের মধ্যে সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এখন উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার দিকেই নজর রয়েছে।

ডিআর