কোটি কোটি টাকা পকেটে, দায়িত্ব না দিয়েই লাপাত্তা পিডি
বিএডিসির ৬০২ কোটি টাকার সেচ প্রকল্প
মাঠে নালা নেই, পানি নেই—কিন্তু কাগজপত্রে ‘কাজ শেষ’। সিন্ডিকেটের পকেটে চলে গেছে কোটি কোটি টাকা। এই জালিয়াতিতে উপকূলের হাজার হাজার কৃষকের সেচের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ। কাগজপত্রে ভুতুড়ে উন্নয়ন এই হরিলুট হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৬০২ কোটি টাকার ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পে। এই জালিয়াতির ‘নায়ক’ খোদ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম।
এদিকে, অনিয়ম ফাঁস হতেই নতুন পিডি অফিসে পা রাখার ঠিক এক ঘণ্টা আগে দপ্তর ছেড়ে চম্পট দেন তিনি। লাপাত্তা হলেও শেষ মুহূর্তে পছন্দের লোকজনকে টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া এবং সহকারী প্রকৌশলীকে দিয়ে সাব-কন্ট্রাক্ট করাতে মরিয়া হয়েছেন নুরুল ইসলাম। ইতিপূর্বেও ৩৬ খাতের দুর্নীতির রেকর্ড রয়েছে বিতর্কিত এই পিডির বিরুদ্ধে।
কাজ না করেই ১০০ কোটেশনে কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পটিতে গত দুই অর্থবছরে মাঠপর্যায়ে কোনো কাজই করা হয়নি। অথচ চট্টগ্রাম জোন ও দোহাজারীতে ৩০টি গ্রুপ এবং রাউজান, মিরসরাই ও হাটহাজারী জোনে ৩৫টি গ্রুপসহ অন্তত ১০০টি কোটেশন দরপত্র দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল উত্তোলন করা হয়েছে। রাউজান, মিরসরাই ও হাটহাজারী জোনের দায়িত্বে থাকা বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের সঙ্গে যোগসাজশে মাঠপর্যায়ে কোনো অবকাঠামোগত কাজ না করেই এসব ভুয়া বিলের ছাড়পত্র দেন পিডি নুরুল ইসলাম।
দায়িত্ব হস্তান্তরে লুকোচুরি
নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির মধ্যে গত ২১ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-২ শাখার সচিব আবু জাফর রাশেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে বিএডিসি রাঙ্গামাটি সেচ রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী (সেচ) মোহাম্মদ সাহেদকে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর নতুন পিডির দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল।
নতুন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাহেদ বলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে তিনি কালুরঘাটস্থ বিএডিসি চট্টগ্রাম সার্কেল অফিসে দায়িত্ব নিতে যান। তবে তাঁর পৌঁছানোর ঠিক এক ঘণ্টা আগে অফিস ছেড়ে পালিয়ে যান নুরুল ইসলাম। এর আগে তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে আদেশের কপি পাঠানো হলেও এবং একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগ রয়েছে, বদলি ঠেকানোর জন্য পদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে দৌড়ঝাঁপ ও ভারী তদবির চালাচ্ছেন তিনি।
সহকারী প্রকৌশলী নিজেই যখন ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’
অফিস ছেড়ে পালিয়ে বেড়ালেও গত ৬ সেপ্টেম্বর ইস্যুকৃত বিভিন্ন টেন্ডারের কাজ তড়িঘড়ি মূল্যায়ন করে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন নুরুল ইসলাম। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পিডির নিজস্ব সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে, মেসার্স শেখ আনাছ, এম.আর.এস. বিপ্লব, ম্যাক্স ওয়েল, সেবা এন্টারপ্রাইজ, সাদিক এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সিনহা এন্টারপ্রাইজ এবং এ রহমান এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডার ও কোটেশনে একাধিক কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ সরাসরি পিডি নুরুল ইসলামের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে কাজ করেন। অন্য কোনো সাধারণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশকে জোরপূর্বক ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ হিসেবে কাজ দিতে বাধ্য করা হতো একাধিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে।
এছাড়া চলতি বছরের মে মাসে মেগা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করে দশটি প্রতিষ্ঠানকে কাজের জন্য মূল্যায়ন করা হলেও, ৯টি বৈধ প্রতিষ্ঠানকে অদ্যাবধি কোনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ম না মেনে টেন্ডারের আগে প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের ভাই বিপ্লবের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এম.আর.এস. বিপ্লব’কে কাজটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই বিলের টাকাও তুলে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিতর্কিত এই কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ।
৩৬ খাতের অনিয়মের পুরোনো রেকর্ড
নুরুল ইসলামের দুর্নীতির রেকর্ড নতুন নয়। ২০২১ সালের ২০ জুন অনিয়মের অভিযোগে মাত্র চার মাসের মাথায় তাঁকে এই প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে হবিগঞ্জে বদলি করা হয়েছিল। সেখানে বিএডিসির ভবন নির্মাণে নিম্নমানের কাজ করার প্রমাণ মেলে। কর্তৃপক্ষের তদন্তে সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি খাতে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল।
কৃষি ও সেচের জন্য বড় ধাক্কা
উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সুপেয় ও সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট নিরসনে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন মেয়াদে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকার এই সেচ প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ৮০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এনে প্রতি বছর ১ লাখ টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও শুরুতেই পিডির হরিলুটে ভেস্তে যেতে বসেছে এই সরকারি উদ্যোগ।
অভিযোগ অস্বীকার করে বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই ভিত্তিহীন। তিনি সাব-কন্ট্রাক্ট ও প্রকল্প তদারকি সংক্রান্ত কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন।
এসব জালিয়াতি ও পলায়নের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (বীজ বিপণন) মো. মাহমুদুল আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া বিএডিসির সচিব (উপসচিব) আবু জাফর রাশেদের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।
এসএ




Comments