Image description

নীল বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি আর সুন্দরবনের সবুজ অরণ্যের সান্নিধ্যে প্রতিবছর শীতের আগমনে প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে ওঠে দুবলার চর। বালুচরে সারি সারি গোলপাতার ঘর, হাজারো মাছ শুকানোর চাতাল আর রোদে শুকানো মাছের পরিচিত গন্ধে গড়ে ওঠে এক বিশাল অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী। উপকূলের হাজারো জেলের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় উৎস এই দুবলার চর।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে দুবলার চরের পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুম। চলবে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। টানা ১৫১ দিনের এই মৌসুমে সাগরপাড়ের নির্জন চর পরিণত হবে ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মমুখর জনপদে।

মৌসুম শুরুর আগেই উপকূলজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল ও শরণখোলা, খুলনার কয়রা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বরগুনা-পটুয়াখালীসহ চট্টগ্রামের বাঁশখালী পর্যন্ত বিভিন্ন জেলেপল্লিতে এখন দুবলার চরে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

কেউ মাছ ধরার নৌকায় আলকাতরা লাগাচ্ছেন, কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন। আবার কেউ বাঁশ, কাঠ, গোলপাতা, দা-কুড়াল, চাল-ডাল, খাবার পানি ও প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার নৌকায় তুলছেন। অনেক জেলে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, পাঁচ মাসের পরিশ্রমে পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও কাটবে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের অধীন দুবলার চরের পাঁচটি নির্ধারিত পয়েন্টে গড়ে ওঠে এ অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী। স্থানগুলো হলো—আলোরকোল, মাঝেরকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, শ্যালার চর ও মেহের আলীর চর। এসব চরকে ঘিরেই চলে দেশের অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি উৎপাদন কার্যক্রম।

বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি চরে গড়ে প্রায় এক হাজারটি করে মাছ শুকানোর চাতাল স্থাপন করা হয়। প্রতিটি চাতালে কাজ করেন ১৫ থেকে ২০ জন জেলে ও শ্রমিক। ভোররাত থেকে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার পর মাছ নিয়ে চরে ফেরেন তাঁরা। এরপর মাছ কাটা, পরিষ্কার করা, ধোয়া এবং চাতালে বিছিয়ে রোদে শুকানোর কাজ চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

এখানে লইট্যা, ছুরি, চ্যাঁপা, ফাইস্যা, রূপচাঁদা, চিংড়ি ও পোয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো ধরনের কীটনাশক ছাড়াই প্রাকৃতিক রোদ ও সাগরের বাতাসে এসব মাছ শুকানো হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুবলার চরে উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এ খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। পাশাপাশি বন বিভাগও প্রতি মৌসুমে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে।

তবে শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে বন বিভাগ। বনজ সম্পদ ধ্বংস, বন্য প্রাণী শিকার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিবেশদূষণ ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ নজরদারি।

এ বিষয়ে চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস মানবকণ্ঠকে বলেন, “জেলেদের নিরাপত্তা আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। তবে সুন্দরবনের একটি পাতাও কাটা যাবে না। ঘর তৈরির সব উপকরণ বাইরে থেকে আনতে হবে। নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ, হরিণ শিকার, পলিথিন ব্যবহার এবং বিষ দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ মৌসুমে স্মার্ট পেট্রোলিং টিম, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ টহল পরিচালনা করা হবে।”

চাঁদপাই স্টেশনের সহকারী স্টেশন কর্মকর্তা মোস্তাকিম বিল্লাহ বলেন, “১ নভেম্বর থেকে বৈধ পাস ছাড়া কাউকে চরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। কেউ পরিবেশদূষণ করলে তাৎক্ষণিকভাবে পাস বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রকৃতপক্ষে দুবলার চর শুধু শুঁটকি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। সাগরের বুকে গড়ে ওঠা এই অস্থায়ী জনপদে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়, অন্যদিকে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব প্রস্তুতি শেষে এখন শুধু মৌসুম শুরুর অপেক্ষা। ১ নভেম্বর থেকে আবারও জেলেদের হাঁকডাক, মাছ ধরার ব্যস্ততা আর শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞে মুখর হয়ে উঠবে দুবলার চর। হাজারো জেলের জীবিকার এই আয়োজন সুন্দরবনের প্রকৃতি অক্ষুণ্ন রেখেই সফলভাবে সম্পন্ন হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

এসএ