লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রাম থেকে এক নিষ্পাপ আলোর প্রদীপ নিভে গিয়েছিল অকালেই। মাত্র সাত বছর বয়সী অবুঝ শিশু নন্দিনী রায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনায় অবশেষে ঘাতকদের উপযুক্ত সাজা শুনিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে, মাত্র ছয় কার্যদিবসের অভূতপূর্ব সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়া শেষে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্র রায়কে (২২) মৃত্যুদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এই পৈশাচিক অপরাধে সহায়তার কারণে বিধানের পিতা রনজিৎ কুমার রায় ও মাতা মমতা রানীকে প্রদান করা হয়েছে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড।
রোববার (২৩ আগস্ট) বেলা ঠিক ১১টায় লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মোঃ হায়দার আলী এক থমথমে ও আবেগঘন পরিবেশে বিচারালয়ের এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
মামলার বিবরণী যেন এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। গত ১৫ জুনের এক অপরাহ্ণে নিজ ভিটে থেকে আচমকা নিখোঁজ হয়ে যায় নলিনী কান্তের স্নেহের পুতুল নন্দিনী। পরদিন ১৬ জুনের নিবিড় প্রভাতে গৃহপ্রাঙ্গণের অদূরে এক ভুট্টা ক্ষেতের নিভৃত গর্তে মেলে তার বস্তাবন্দি নিথর দেহ। সোনার কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার লোভ এবং প্রতিবেশীর পারিবারিক বিদ্বেষের বলি হতে হয়েছিল এক অবুঝ প্রাণকে। এ ঘটনায় কান্নায় ভেঙে পড়া পিতা নলিনী মোহন বর্মন আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তৎক্ষণাৎ প্রতিবেশী বিধান চন্দ্রকে গ্রেপ্তার করলে, সে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা দণ্ডবিধির ৩০২/৪০৪/২০১/৩৪ ধারায় চার্জশীট পেশ করলে, গত ১৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করা হয়। ১৭, ১৮ ও ১৯ আগস্ট মাত্র তিন দিনের নিবিড় শুনানিতে ২৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। ২০ আগস্টের যুক্তিতর্ক শেষে ২৩ আগস্টকে রায় ঘোষণার কাঙ্ক্ষিত দিন হিসেবে ধার্য করেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) এই ঐতিহাসিক রায়ের পর বলেন, "মাত্র ছয় কার্যদিবসে ২৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং আলামত পর্যালোচনা করে আমরা অপরাধের সত্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার এ দৃষ্টান্ত দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।" তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী এ রায়ে সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।
আদালতের এই সিদ্ধান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন নিহত নন্দিনীর বিয়োগব্যথায় কাতর বাবা নলিনী কান্ত। ছলছল চোখে তিনি বলেন, "আমার ওই নিষ্পাপ অবুঝ শিশুটিকে অতীব নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বিচারালয়ের এই সিদ্ধান্তে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। এখন সরকারের কাছে শুধু একটাই আকুল প্রার্থনা এই ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।"
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সমগ্র আদালত চত্বরে জোরদার করা হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী। বিচারকার্য শেষে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কড়া নিরাপত্তায় জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
ডিআর




Comments