‘ক’ শ্রেণির মর্যাদা পেলেও অন্ধকারে পাইকগাছা, নষ্ট বাতি ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ পৌরবাসী
কাগজে-কলমে ‘খ’ শ্রেণি থেকে উন্নীত হয়ে বর্তমানে ‘ক’ শ্রেণির মর্যাদা পেয়েছে খুলনার পাইকগাছা পৌরসভা। শ্রেণি পরিবর্তনের সাথে সাথে স্থানীয় নাগরিকদের প্রত্যাশার পারদও বেড়েছে বহুগুণ। তবে সেই প্রত্যাশার সাথে বাস্তব চিত্রের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। রাত নামলেই পৌর এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে নামছে অন্ধকারের ছায়া। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে সড়কবাতি নষ্ট, কোথাও সৌরশক্তিচালিত (সোলার) বাতি অচল, আবার কোথাও বাতি জ্বললেও গাছের ডালপালার কারণে তা সড়কে আলো ছড়াতে পারছে না।
পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে সড়কবাতি স্থাপন করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক বাতিই দীর্ঘদিন ধরে জ্বলছে না। একসময় সৌরশক্তিচালিত সড়কবাতি স্থাপনে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে সেগুলোর বেশিরভাগই অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও সোলার প্যানেল বা বাতির অবকাঠামো দৃশ্যমান থাকলেও তা সচল না থাকায় লোডশেডিংয়ের সময় বিকল্প আলোর সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকরা।
বর্তমান সময়ে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে এমনিতেই অতিষ্ঠ জনজীবন। এর ওপর সড়কবাতিগুলো অচল থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ থাকলে কোথাও বাতি জ্বললেও তার আলোর তীব্রতা খুবই কম। আর বিদ্যুৎ চলে গেলে অচল সোলার বাতির কারণে অনেক সড়ক প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে যায়। যদিও সন্ধ্যার পর দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে তার সাময়িক আলোয় পথচলা যায়, কিন্তু গভীর রাতে বা লোডশেডিং শুরু হলে পুরো চিত্র পাল্টে যায়। তখন পথচারী ও যানবাহন চালকদের একপ্রকার ভুতুড়ে অন্ধকারের মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
অন্ধকারের নেপথ্যে শুধু নষ্ট বাতি বা লোডশেডিংই দায়ী নয়, সচল থাকা সড়কবাতির আলো অনেক স্থানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে গাছের ডালপালা ও ঘন পাতার কারণে। বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে, বাতির চারপাশে গাছের ডালপালা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে আলো সরাসরি সড়কে পৌঁছাতে পারছে না। স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত গাছের ডালপালা ছাঁটাই করা হলে বিদ্যমান সচল বাতিগুলো দিয়েই সড়কগুলো আরও ভালোভাবে আলোকিত রাখা সম্ভব হতো।
পৌর এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট পাইকগাছা জিরো পয়েন্ট থেকে শিববাড়ি সড়ক। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের বিভিন্ন অংশ রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাবে সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রাত গভীর হলে এই নির্জন ও অন্ধকার পরিবেশের সুযোগ নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ছিনতাই বা অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
পর্যাপ্ত আলোর অভাবে শুধু নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হচ্ছে না, বাড়ছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। সড়কের খানাখন্দ, ভাঙা অংশ কিংবা ইটের খোয়া অন্ধকারে সহজে চোখে পড়ে না। ফলে ইজিবাইক, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকদের পাশাপাশি পথচারীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এই অন্ধকার সড়কগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
পৌরবাসীর মনে এখন বড় প্রশ্ন—সড়কের পাশে শুধু বাতি স্থাপন করলেই কি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ? বাতি নষ্ট হওয়ার পর তা দ্রুত মেরামত করা, অচল সোলার বাতি সচল রাখা এবং গাছের ডালপালা ছাঁটাইয়ের মতো সাধারণ কাজগুলো কেন নিয়মিত তদারকি করা হবে না? সরকারের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা সোলার বাতিগুলো কেন সচল থাকছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও বাজার চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত তালিকা প্রস্তুতের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অচল সড়কবাতি দ্রুত মেরামত, সোলার বাতি সচল করা এবং বাতির চারপাশের গাছের ডালপালা নিয়মিত ছাঁটাই করার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ায় নাগরিকরা নিয়মিত কর ও বিভিন্ন ফি পরিশোধ করছেন। অথচ বিনিময়ে রাতের বেলায় অন্ধকার সড়কে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আগেই পৌর কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এ বিষয়ে পৌরসভার সড়ক বাতি পরিদর্শক তন্ময় মন্ডল জানান, “কোথায় কোথায় সড়ক বাতির সমস্যা রয়েছে, সেসব বিষয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করতে হবে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা সেগুলো দেখে প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা করব।”
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, জনস্বার্থের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব পৌরসভার হলেও প্রতিটি নষ্ট বাতির জন্য নাগরিকদের আলাদাভাবে অভিযোগ করার অপেক্ষায় থাকা কতটা যৌক্তিক?
ডিআর




Comments