Image description

এক হাতে জীবিকার সংগ্রাম, অন্য হাতে জ্ঞান বিলানোর দায়িত্ব। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, চোখে-মুখে স্পষ্ট বার্ধক্যের ছাপ। তবু ফজরের আজান শেষ হলেই মসজিদের বারান্দায় হাজির হন তিনি। তাঁর অপেক্ষায় থাকে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক শিক্ষার্থীরা। এরপর শুরু হয় আরবি ও কোরআন শিক্ষার পাঠ। বিনিময়ে কোনো বেতন নেন না। এভাবেই প্রায় সাত দশক ধরে নীরবে-নিভৃতে মানুষের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মিয়াপুর গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী মো. মুছা শেখ।

প্রায় ৭০ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে আরবি, কোরআন ও হাদিস শিক্ষা দিয়ে আসছেন তিনি। প্রতি বছর তাঁর কাছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু-কিশোর এবং ৩০ থেকে ৪০ জন বয়স্ক মানুষ আরবি ও কোরআন শিক্ষা নিতে আসেন। মসজিদের বারান্দাই তাঁর পাঠশালা, আর শিক্ষার্থীরাই তাঁর আপনজন। সরকারি কোনো অনুদান কিংবা বেতন না পেলেও থেমে নেই তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা।

চারঘাট পৌরসভার মিয়াপুর গ্রামে স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন মুছা শেখ। সংসারের ব্যয় মেটাতে স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেই দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের পড়ান। বয়সের ভারে শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহে এতটুকু ভাটা পড়েনি তাঁর।

মুছা শেখ জানান, তাঁর বয়স যখন প্রায় ১৫ বছর, তখন থেকেই বাবার সঙ্গে মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন। তাঁর বাবা ওই মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন। সে সময় মসজিদটি ছিল অনেকটা জরাজীর্ণ। মসজিদের বারান্দায় বসেই গ্রামের শিশুদের আরবি শিক্ষা দিতেন তাঁর বাবা।

বাবার কাছ থেকেই আরবি শিক্ষা নেন মুছা শেখ। ফজরের নামাজের পর বাবার কাছে পড়াশোনা করতেন। একই সঙ্গে বাবাকে অন্য শিশুদের পড়াতেও সহযোগিতা করতেন। সেই সময় থেকেই আরবি শিক্ষার সঙ্গে তাঁর পথচলা শুরু। বাবার মৃত্যুর পর তিনি মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নেন। তবে বাবার দেখানো শিক্ষাদানের পথ থেকে আর সরে যাননি।

সময়ের সঙ্গে সেই পুরোনো ভাঙা মসজিদ পাকা হয়েছে। বদলেছে চারপাশের পরিবেশ। কিন্তু বদলায়নি মুছা শেখের পাঠদানের নিয়ম। এখনো ফজরের নামাজ শেষে সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত মসজিদের বারান্দায় বসে শিক্ষার্থীদের পড়ান তিনি।

শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেননি মুছা শেখ। বছরের পর বছর তাঁর কাছে পড়েছে গ্রামের অসংখ্য শিশু। অনেকেই বড় হয়ে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ দূরে চলে গেছেন, আবার কেউ নিজের সন্তানকেও তাঁর কাছে পড়তে পাঠিয়েছেন।

মুছা শেখ বলেন, “অভাবের তাড়নায় কোনোদিন পড়াশোনা করতে পারিনি। তাই মনে হয়েছে, আমি যদি অন্যের সন্তানদের পড়াতে পারি, তাহলে হয়তো তাদের উপকার হবে। আমার এলাকার কোনো শিশু যেন আরবি ও কোরআন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, এটাই আমার ইচ্ছা।”

তিনি আরও বলেন, “সকাল, দুপুর কিংবা রাতে যখনই কেউ মসজিদে আসে, আমি তাকে আরবি, কোরআন ও হাদিস শেখানোর চেষ্টা করি। শুধু পড়াশোনা নয়, ভালো মানুষ হওয়ার পরামর্শও দিই।”

মুছা শেখের কাছে পড়তে আসা বয়স্ক শিক্ষার্থী সজল, মুকুর, বেল্লাল ও খালেক জানান, তাঁর কাছে আরবি ও কোরআন মাজিদ পড়ানো হয়। এর পাশাপাশি নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ভালো-মন্দের বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়।

শিশু শিক্ষার্থী সামিউন, রাহিম ও আলিফও নিয়মিত তাঁর কাছে পড়তে আসে। তাদের কাছে মুছা শেখ শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন অভিভাবকের মতো।

দীর্ঘদিন বিনা বেতনে অন্যের সন্তানদের পড়ালেও নিজের সংসারও স্বচ্ছল নয় মুছা শেখের। স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তাঁর পরিবার। মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার।

এরপরও অন্যের সন্তানদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেন না তিনি। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেও নিয়মিত কোনো সহায়তা পান না বলে জানান মুছা শেখ।

মিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা মুরাদ পাশা বলেন, “মুছা শেখ সাহেব দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে এলাকার শিশুদের আরবি, কোরআন ও হাদিস শিক্ষা দিয়ে আসছেন। তাঁর মতো মানুষ সমাজের সম্পদ। তাঁর এই দীর্ঘদিনের অবদানকে মূল্যায়ন করে সরকারি স্বীকৃতি ও সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন।”

বয়স ৮৫ পেরিয়েছে। শরীরও আগের মতো সাড়া দেয় না। তবু শিক্ষাদান বন্ধ করার কথা ভাবেন না মুছা শেখ। যতদিন শরীর সায় দেবে, ততদিন মসজিদের বারান্দায় বসে শিশু ও বয়স্কদের আরবি-কোরআন শেখাতে চান তিনি।

তাঁর প্রত্যাশা, দীর্ঘ সাত দশকের বিনা পারিশ্রমিকের এই শিক্ষাসেবার স্বীকৃতি মিলবে। সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও ভালোভাবে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর সুযোগ হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন রাজশাহীর ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদ বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রায় সাত দশক ধরে মসজিদের ছোট্ট বারান্দায় বসে মুছা শেখ যে পাঠশালা চালিয়ে যাচ্ছেন, তার কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই বেতনভুক্ত শিক্ষকতার পরিচয়ও। আছে শুধু মানুষের সন্তানকে মানুষ করার প্রত্যয়। নিজের জীবনে শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া এই প্রবীণ মানুষটি যেন অন্য প্রজন্মের জন্য রেখে চলেছেন জ্ঞানের এক নীরব বাতিঘর।

এসএ